শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

নিউইয়র্কের মেয়র মামদানির সামনে ৪ চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ২০২৬ সালের প্রথম দিনে তীব্র শীতের মধ্যে হাজারো উচ্ছ্বসিত নিউইয়র্কবাসী ও প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট মিত্রদের উপস্থিতিতে নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র জোহরান মামদানি শহরের জন্য নতুন গল্প বলার অঙ্গীকার করেন।

নিজের অভিষেক ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন, সিটি হল নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী জীবনযাপন ও সমৃদ্ধির কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে—যেখানে সরকার হবে জনগণের মতো, যাদের সে প্রতিনিধিত্ব করে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে তিনি সার্বজনিক শিশু যত্ন, বিনামূল্যের গণপরিবহন বাস এবং সিটি পরিচালিত মুদি দোকানের মতো বড় পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন।

তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে তাকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক প্যাট্রিক ইগান বলেন, “এসব বাস্তবায়নে তিনি নিজের সব রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করবেন। তবে নিউইয়র্ক একটি বিশাল ও জটিল শহর—সবকিছু আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।”

১. নীতিগত প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন

মামদানির কর্মসূচির মূল লক্ষ্য জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। এর মধ্যে রয়েছে ভর্তুকিপ্রাপ্ত বাসভবনে ভাড়া বৃদ্ধি স্থগিত রাখা এবং সবার জন্য বিনামূল্যে শিশু যত্ন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে এবং কম খরচে নিতে পারবেন। যেমন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে নিজের নীতির পক্ষে থাকা সদস্য নিয়োগ করে ভাড়া স্থগিত রাখা সম্ভব।

তবে রাজ্য ও সিটি বাজেট ঘাটতির মুখে বড় প্রতিশ্রুতির অর্থ জোগাড় করা কঠিন হবে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রবার্ট শ্যাপিরো বলেন, “বিনামূল্যের বাস বা শিশু যত্ন দিতে অর্থ লাগে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিউইয়র্ক রাজ্যের আর্থিক সক্ষমতা এবং গভর্নরের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।” মামদানি জানিয়েছেন, ধনীদের ওপর নতুন কর আরোপ করে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব। তিনি করপোরেট করহার ৭.২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১.৫ শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এ পরিবর্তনের জন্য রাজ্য সরকারের সমর্থন প্রয়োজন, যা অনিশ্চিত।

২. হোয়াইট হাউজের হস্তক্ষেপ এড়ানো

নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মামদানিকে কমিউনিস্ট আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করেন এবং নির্বাচিত হলে ফেডারেল অর্থ সহায়তা বন্ধের হুমকি দেন। তবে নির্বাচনের পর তাদের প্রথম সাক্ষাৎ প্রত্যাশার চেয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। তবুও অভিবাসন ইস্যুতে ভবিষ্যতে সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এখনো পর্যন্ত ট্রাম্প নিউইয়র্কে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেননি, তবে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।

৩. ব্যবসায়ী নেতাদের পাশে পাওয়া

ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে মামদানির অপ্রত্যাশিত জয়ে ওয়াল স্ট্রিটের অনেক নেতা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কেউ শহর ছাড়ার হুমকি দেন, কেউ অন্য প্রার্থীদের সমর্থনে অর্থ ব্যয় করেন। তবে মামদানি নির্বাচিত হওয়ার পর ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তিনি জেপি মরগ্যান চেজের সিইও জেমি ডাইমনের সঙ্গে বৈঠকের প্রতিশ্রুতি দেন। ডাইমন পরে বলেন, মামদানি নির্বাচিত হলে তিনি সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবুও অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং কর বাড়ালে ধনী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শহর ছাড়তে পারে।

৪. জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা

অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিউইয়র্কের প্রতিটি মেয়রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কোভিড মহামারির সময় অপরাধ বেড়েছিল, তবে ২০২৫ সালে হত্যা ও গুলির ঘটনা প্রায় রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ পরিস্থিতি মামদানিকে সামাজিক সেবা ও সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দিয়েছে।

তিনি কমিউনিটি সেফটি বিভাগ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা মানসিক স্বাস্থ্য ও সংকট মোকাবিলায় কাজ করবে এবং সাবওয়ে স্টেশনে সামাজিক কর্মী মোতায়েন করবে। সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের সময়েও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ডেমোক্র্যাটিক কৌশলবিদ হাওয়ার্ড উলফসন বলেন, মামদানির সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করবে মূলত পুলিশিং ও ছোটখাটো অপরাধ দমনের ওপর। তার মতে, মানুষ যদি নিরাপদ বোধ করে, তবে তারা অনেক সমস্যা সহ্য করতে পারে। আর নিরাপত্তা না থাকলে অন্য কোনো চ্যালেঞ্জই তারা মেনে নেবে না।