মুক্তবাণী ডেস্ক : মুক্তবাণী ডেস্ক
ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সামরিক অভিযান বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। রাজধানী কারাকাস থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন সেনারা তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। অনেকেই এ ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কিংবা আশির দশকে পানামায় মার্কিন অভিযানের। প্রশ্ন উঠছে, মাদুরোর ভবিষ্যৎ কী হবে—সাদ্দাম বা আল-কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের মতো পরিণতি কি তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে?
নিরাপত্তা মহল ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে এ ঘটনার সঙ্গে ১৯৮৯ সালে পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নেরিয়েগাকে আটক করার ঘটনার মিল পাওয়া যায়। মাদুরোর মতো নেরিয়েগার বিরুদ্ধেও মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল ওয়াশিংটন। গ্রেফতারের পর পানামা বাহিনী আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করে।
পানামায় হামলার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, সে দেশে মার্কিন সেনার উপর আক্রমণ এবং আমেরিকান নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। নেরিয়েগাকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে ক্ষমতায় আসা নেরিয়েগা ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন তিনি। অনেকের মতে, তাঁর আমেরিকাবিরোধী অবস্থানই ছিল মূল কারণ। দীর্ঘদিন আমেরিকার কারাগারে থাকার পর তাঁকে ফ্রান্সে পাঠানো হয় বিচারের জন্য। পরে আবার পানামায় ফেরত পাঠানো হয় এবং সেখানেই জেলবন্দি অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।
তবে মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনা নেরিয়েগার থেকে ভিন্ন। কোনও আক্রমণ ছাড়াই কোনও দেশের রাজধানী থেকে প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক আটক করা অনেক বেশি আলোচ্য। একাংশের মতে, এ ঘটনার সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনকে আটক করার ঘটনার মিল রয়েছে।
২০০৩ সালে ইরাকে গুহায় লুকিয়ে থাকা সাদ্দামকে মার্কিন সেনারা আটক করে। ১৩ ডিসেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে থেকেই ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল আমেরিকা। অভিযোগ ছিল, ইরাক বিধ্বংসী অস্ত্র মজুত করছে এবং আমেরিকায় হামলার আশঙ্কা রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে যুদ্ধ ঘোষণা করে জর্জ বুশ প্রশাসন। সাদ্দামকে ইরাকের তিকরিত শহরের একটি গুহা থেকে আটক করা হয় এবং ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
পর্যবেক্ষকরা আবার ২০২২ সালের হন্ডুরাসের ঘটনাও স্মরণ করছেন। সে সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট হার্নান্দেজকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। মাদক ব্যবসার অভিযোগে তাঁকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তাঁর পরিণতি সাদ্দাম বা নেরিয়েগার মতো হয়নি। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর বিশেষ ক্ষমতাবলে ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আমেরিকার টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। দেশটিতে তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলা সরকারকে ‘জঙ্গি গোষ্ঠী’ আখ্যা দেন তিনি। মাদক পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগও তোলা হয়। এর মধ্যেই শনিবার মধ্যরাতে কারাকাসে মার্কিন সেনাদের অভিযান। আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল পামেলা বন্ডি সরাসরি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন।
পামেলা জানিয়েছেন, মাদুরো দম্পতিকে শীঘ্রই আমেরিকার বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি করা হবে। ট্রাম্পও ঘোষণা করেছেন, তাঁদের যুদ্ধজাহাজে চাপিয়ে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মার্কিন ফৌজদারি আইনে তাঁদের বিচার হতে পারে। সেনেট সদস্য মাইক লি জানিয়েছেন, বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো নিশ্চিত করেছেন মাদুরোদের ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করা হবে। শুধু মাদক পাচার নয়, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অবৈধ সরকার পরিচালনার অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। কেউ মনে করছেন, দেশটিতে গণতান্ত্রিক উপায়ে নতুন সরকার গঠন হবে। বিরোধী নেত্রী নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো কিংবা এদমুন্দো গোঞ্জালেস উরুতিয়ার নামও আলোচনায় রয়েছে। সূত্র : আনন্দবাজার