মুক্তবাণী ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার ডিসেম্বরে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে। আমদানি শুল্ক নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগের ব্যাপক প্রসারের কারণে নতুন কর্মী নিয়োগে কোম্পানিগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমলেও বেকারত্বের হার নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে। এই মিশ্র পরিস্থিতি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে নতুন বছরের প্রথম মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএলএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত মাসে কৃষিবহির্ভূত খাতে মাত্র ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এর আগের মাস নভেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ৫৬ হাজার (সংশোধিত)। অথচ রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদেরা ডিসেম্বরে কমপক্ষে ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি মাসে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান প্রয়োজন। বর্তমান বাজার সে তুলনায় তলানিতে অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা বর্তমান অবস্থাকে ‘নো হায়ার, নো ফায়ার’ (নিয়োগ নেই, ছাঁটাইও নেই) মোড হিসেবে অভিহিত করছেন। অর্থাৎ কোম্পানিগুলো বিদ্যমান কর্মীদের ছাঁটাই করছে না, তবে নতুন কাউকে নিয়োগ দিতেও ভয় পাচ্ছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, মার্কিন অর্থনীতি বর্তমানে ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মী উৎপাদনশীলতা বাড়লেও তার মূল কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে এআই খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়কে, যা মানুষের শ্রমের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন শ্রমবাজারের গতি হারানোর অন্যতম কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতি। আমদানি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে কঠোর অভিবাসন নীতি শ্রমের জোগান সংকুচিত করেছে, যা সরাসরি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই এই মন্দা দেখা দিলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা আরও তীব্র হয়েছে।
এদিকে বিএলএস স্বীকার করেছে, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত পূর্ববর্তী ১২ মাসে কর্মসংস্থান তৈরির যে পরিসংখ্যান আগে দেওয়া হয়েছিল, তাতে বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। সংশোধিত হিসেবে দেখা গেছে, বাস্তবে আগের রিপোর্টের চেয়ে প্রায় ৯ লাখ ১১ হাজার কম কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এই ভুল গণনার জন্য দায়ী করা হচ্ছে ‘বার্থ-ডেথ মডেল’কে, যা নতুন কোম্পানি খোলা বা বন্ধ হওয়ার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান অনুমান করে। অসামঞ্জস্য দূর করতে আগামী মাস থেকে বিএলএস তাদের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে।
গত ডিসেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভ তাদের বেঞ্চমার্ক সুদের হার ০.২৫ শতাংশ কমিয়ে ৩.৫০-৩.৭৫ শতাংশে নামিয়েছিল। তবে বর্তমান কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বিবেচনায় কর্মকর্তারা আপাতত সুদের হার আর না কমিয়ে ‘বিরতি’ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ঋণের খরচ কমানোর ক্ষেত্রে তারা সতর্ক থাকতে চান।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, মার্কিন শ্রমবাজারের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো কেবল সাময়িক নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সমস্যা। বাণিজ্যযুদ্ধের ভয় এবং এআইয়ের মাধ্যমে মানুষের কাজ প্রতিস্থাপনের প্রবণতা সুদের হার কমিয়ে সমাধান করা সম্ভব নাও হতে পারে। নিয়োগের এই মন্থরগতি অব্যাহত থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে তা ভোক্তা ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।