আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : আর মাত্র এক মাস পর অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশে সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাস খুব সুখকর নয়। সংবিধান অনুযায়ী যদি প্রতি পাঁচ বছর পর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকত, তাহলে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু তা না হয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এর কারণ রাজনীতিতে অতিসচেতন বাংলাদেশের জনগণের না জানার কথা নয়। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের মধ্যে ১১টি বছর অর্থাৎ দুটি সংসদের পূর্ণ মেয়াদের বেশি সময় খেয়ে ফেলেছে সামরিক শাসন ও তথাকথিত সেনাসমর্থিত অনির্বাচিত বেসামরিক সরকার।
ভারতীয় লোকসভার বয়স ৭৩ বছর। প্রথম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে। পাঁচ বছর মেয়াদের হিসেবে এখন ১৫তম লোকসভা অধিবেশনে থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে ১৮তম লোকসভা কার্যকর রয়েছে। কারণ, তিনটি লোকসভা মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। ১৯৬৭ সালে নির্বাচিত চতুর্থ লোকসভায় কংগ্রেসের একাংশ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ওপর থেকে প্রত্যাহার করায় লোকসভা ঝুলে গিয়েছিল। ১৯৯৮ সালে একাদশ ও ১৯৯৯ সালে দ্বাদশ লোকসভার কোয়ালিশন শরীকরা সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করায় প্রেসিডেন্ট সংবিধান সম্মতভাবে লোকসভা ভেঙে নতুন নির্বাচনের আদেশ দিয়েছিলেন। ভারতে যা হয়েছে তা সংবিধান-সম্মতভাবেই হয়েছে। ওই তিনটি লোকসভার মেয়াদ পূর্ণ না করার পেছনে বাংলাদেশের মতো সংবিধান বহির্ভূত কোনো কারণ ছিল না।
সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গঠিত ১২টি জাতীয় সংসদের প্রতিটি গড়ে সাড়ে তিন বছরের কিছু বেশি সময় পেয়েছে। কিন্তু এই সাড়ে তিন বছর সব কটি সংসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এসব সংসদের মধ্যে ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ সংসদের অস্তিত্ব ছিল সর্বনিম্ন ১২ দিন এবং দ্বাদশ সংসদ সাত মাস। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচন দৃশ্যত সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক বলে দাবি করা হলেও নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে, ফলাফলকে আওয়ামী লীগের অনুকূলে নেওয়ার জন্য অনাকাংখিত যা কিছু করা আবশ্যক ছিল নির্বাচন কমিশন, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন মিলে সবকিছু করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে যেভাবে পরবর্তী তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা নির্বাচনব্যবস্থাকে শুধু কলঙ্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, নির্বাচনের ওপর থেকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ উঠিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে। নামে ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান’ হলেও কমিশন কার্যত পরিণত হয়েছিল শেখ হাসিনার অধীনস্ত এবং তার ইশারা-ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকা একটি বিভাগে।
আওয়ামী লীগের নাঙ্গা তরবারির নিচে নির্বাচন কমিশন পূর্ববর্তী তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করা তো দূরের কথা, তরবারির কোপে ধড় থেকে মস্তক বিদীর্ণ হওয়ার ভয়ে শেখ হাসিনা যা যা নির্দেশ দিয়েছেন, দাসানুদাসের মতো তারা তা-ই করেছে। একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারও যদি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সৎ ও ন্যায়ানুগ হতেন, তাহলে তিনি সরকার প্রধানের অন্যায়, অসাংবিধানিক হুকুম-আহকামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। তাঁর কাজে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে অভিযোগ এনে পদত্যাগ করতেন। তবুও বোঝা যেত যা কিছু ঘটছে বা ঘটানো হয়েছে, তা অন্যায় ও সংবিধানপরিপন্থি এবং জনস্বার্থবিরোধী হয়েছে। বরং এর উল্টোটাই হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে কমিশনের প্রত্যেক মেরুদন্ডহীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রতিটি নির্বাচনের পর দাবি করেছেন, তাঁদের অধীনে নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে’, ‘প্রশাসন নির্বাচন পরিচালনায় পক্ষপাতহীনভাবে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছে’, ‘আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ঘুরে ঘুরে নির্বাচন কেন্দ্র দেখে সন্তুষ্ট হয়েছেন’, ইত্যাদি।
এই পটভূমিতে নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে দক্ষতার সঙ্গে ও পক্ষপাতহীনভাবে দায়িত্ব পালনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ইতোমধ্যে কিছু কিছু অভিযোগ উঠেছে, যা প্রবাদের ‘এক যাত্রায় দুই ফল’-এর মতো। দলবিশেষের যেসব প্রার্থী দ্বৈত নাগরিক বা বিদেশি নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করেননি, রিটার্নিং অফিসাররা তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের সার্টিফিকেট জমা দেওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে, যাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বিচারাধীন আছে, একটি দলের ক্ষেত্রে তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ করা হয়েছে, জামায়াত প্রার্থীর মামলা খারিজ হওয়া বা একই মামলা বিবেচনাধীন থাকা অবস্থায় আদালতের ছাড়পত্র জমা দিয়ে ২০০৮ সালে বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার প্রমাণপত্র দাখিল করলেও তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। প্রধান দুটি দল বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের নিরাপত্তাদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের বিষয়ও নির্বাচন কমিশনের গোচরে আনা হয়েছে।
জামায়াতের জন্য ক্ষমতার রাজনীতিতে ভালো না করতে পারার প্রথম বাধা যে জামায়াতবিরোধী ইসলামি দল ও পীরের মুরিদগণ, তা আগেও একাধিকবার উল্লেখ করেছি। আওয়ামী লীগের নিজস্ব ভোট এবং তাদের স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে বিবেচিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভোট বাগাতে জামায়াত খুব একটা সুবিধা করতে পারবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
অতীতের সব নির্বাচনের সঙ্গে আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনের তুলনা না করে ‘বেঞ্চমার্ক’ বা ‘মানদণ্ড’ হিসেবে যদি ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনা হয়, তাহলেও সম্ভবত সুবিচার করা হবে না। কারণ একটি বড় দল, যারা স্বাধীন দেশের প্রায় অর্ধেক সময় ধরে সরকারে ছিল, সেই দলটি নির্বাচনে অনুপস্থিত। এখন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দল দুটি-বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। একটি খণ্ডিত মেয়াদসহ বিএনপি তিনবার দেশের সরকার পরিচালনা করেছে। জামায়াতে ইসলামীর ভাগ্যে এখন পর্যন্ত পাকিস্তান বা বাংলাদেশে সরকার পরিচালনার সুযোগ আসেনি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৯১ সালে জামায়াত সর্বোচ্চ ১২.১৩ শতাংশ ভোট এবং ১৮টি আসনে বিজয় লাভ করেছিল। ওই সময় দলটির প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা ছিল ৪১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬১। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত হয় ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারে উচ্চাভিলাষী ছিল অথবা বিএনপিকে একটু সবক শেখানোর জন্য তাদের পরাজিত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর উদ্দেশ্যে মৌন সম্মতি দিয়ে তারা সংসদের ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিয়েছিল। পেয়েছিল মাত্র ৩টি আসন।
জামায়াতের ঐশী কৌশলে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে হেসেখেলে বিজয়ী হয়ে ২১ বছর পর সরকার গঠন করেছিল। জামায়াতের কল্যাণে বিজয় হাসিল করে কি আওয়ামী লীগ জামায়াতকে কোলে তুলে নিয়েছিল? নেয়নি। বরং তারা আশা করেছিল, ২০০১ সালের নির্বাচনেও জামায়াত বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবে এবং আবারও তারা ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের আশার গুড়ে বালি ঢেলে জামায়াত বিএনপির বক্ষলগ্ন হলে আওয়ামী লীগের সব ক্ষোভ গিয়ে পড়ে জামায়াতের ওপর। জামায়াতকে সাইজ না করতে পারলে তাদের পক্ষে যে ঝামেলামুক্তভাবে বারবার ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়, তা তারা বুঝে গিয়েছিল।
আওয়ামী লীগকে এ ব্যাপারে ইন্ধনও জুগিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তিনি দিল্লির পাঁচটি শীর্ষ দৈনিকের সম্পাদককে তার সরকারি বাসভবনে চা পানের আমন্ত্রণ জানিয়ে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তাদেরকে জানান, বাংলাদেশের জনগণের ২৫ শতাংশ চরম মৌলবাদী ও কট্টর ভারত বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক। বাংলাদেশ জঙ্গি রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে মর্মে প্রমাণের অজুহাত হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য ভারতীয় গণমাধ্যম লুফে নেয়।
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাও তক্কে তক্কে থাকেন কখন কীভাবে জামায়াতকে নির্মূল অথবা নিদেনপক্ষে পঙ্গু করে ফেলা যায়। সে সুযোগ আসে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর। আওয়ামী লীগ সরকার, সরকারি দল ও অঙ্গসংগঠনসমূহ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো জামায়াতের ওপর যে নারকীয়তা চালায় আধুনিক বিশ্বের কোনো দেশে তার নজির পাওয়া যাবে না। তারা প্রহসনের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে। গুম ও হত্যার শিকার হয় আরও বহুসংখ্যক। তাদের আশ্রয়হীন করে ফেলা হয়।
জামায়াত যে পুনরায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে, তা অন্তত আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করেনি। তারা নিজেদের অপকর্ম, সাফল্য, আত্মতৃপ্তি ও আত্মপ্রশংসায় এত মগ্ন ছিল যে জামায়াতের নির্দোষ নেতাদের ওপর জঘন্য সব অপরাধের সংঘটনের অভিযোগ এনে বিচারের নামে তাদের হত্যা করায় জনগণ যে কতটা ক্ষুব্ধ, ক্ষমতার মদমত্ততায় আওয়ামী লীগ তা আঁচ করে উঠতে পারেনি। এই চরম অন্যায় করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ মানুষের আস্থা হারিয়েছে। গুম, খুন, অবাধ লুণ্ঠন, পরস্ব অপহরণ, দখল ইত্যাদি তো ছিল। জামায়াতের প্রতি জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশের সহানুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলুম থেকে মুক্তির আনন্দ ও সহানুভূতির কারণে আগামী নির্বাচনে জামায়াতের ভোট নিঃসন্দেহে বাড়বে। আসনসংখ্যাও যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু জামায়াত সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে আমি আমার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিচারবোধ থেকে বিশ্বাস করি না।
দেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর সার্বক্ষণিক দৃষ্টি রাখা এবং রাজনীতিতে ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সামান্য পঠন-পাঠন এবং সর্বোপরি একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নের উপসংহার হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী যথেষ্ট ভালো করবে এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় সংসদের বিতর্কে, বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজেদের আরও দক্ষ ও পরিপক্ব করে তোলার সুযোগ লাভ পাবে, যদি না অতীতের মতো সংবিধান বহির্ভূত কোনো হস্তক্ষেপ অথবা ‘অ্যাক্ট অফ গড’ বা ঐশ্বরিক কোনো অঘটন ঘটে।
এ কথা সত্য, জুলাই বিপ্লবের সময় থেকে মেঘনা-যমুনার পানি উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে। পানির ধারা নিম্নগামী না হয়ে উৎসের দিকে যাচ্ছে। হতেই পারে। একটি আরবি প্রবাদেও বলা হয়েছে: “কুল্লু শাইয়িন ইয়ারজিউ ইলা আসলিহি”- ‘প্রত্যেক বস্তু তার নিজের উৎসের দিকে ফিরে যায়।’ শেখ হাসিনার পুরো মেয়াদজুড়ে নির্মম নিপীড়িত জামায়াত-শিবিরের দিকে সমর্থনের জোয়ার শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর কেটে না যেতেই ছাত্রলীগের দাপটে ক্যাম্পাসগুলোতে টিকতে না পারা শিবিরের প্রতি ছাত্রদের সমর্থন এত বেড়েছে যে, তাদের প্যানেল ডাকসু, রাকসু, চাকসু, জাকসু ও জকসু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৯০ হাজার ছাত্র ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ধরেই নেওয়া যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদে জিতে শিবির আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের মুরুব্বি সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে জোরালো করেছে। ছাত্র সংসদে নির্বাচিত কর্মকর্তা ও তাদের ভোটদানকারীরা তাঁদের পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে থাকবে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু আমরা যদি ২০০১ এবং ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, ২০০১ সালে বিএনপি আসন পেয়েছিল ১৯৩টি এবং ভোট লাভ করেছিল মোট প্রদত্ত ভোটের ৪০.৯৭ শতাংশ এবং আওয়ামী লীগ ৪০.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছিল ৬২ আসনে। সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রদত্ত ভোটের ৪৮.০৪ শতাংশ পেয়ে জয়ী হয় ২৩০ আসনে এবং বিএনপি ৩২.৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় মাত্র ৩০টি। অবিশ্যাস্য এক ফলাফল। বিএনপির জনপ্রিয়তায় এতটা ধস নামেনি যে, তারা মাত্র ৩০টি আসন লাভ করবে এবং তাদের ভোট আগের নির্বাচনের চেয়ে ৮ শতাংশ কমে যাবে। রাজনীতিসচেতন ব্যক্তিদের মনে থাকার কথা, ২০০৮-এর নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যেই ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকারকে টোপ দিয়েছিলেন যে, তাদের মেয়াদে যা কিছু আইন-বহির্ভূত হয়েছে, সেসব থেকে তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হবে। হাসিনার এই টোপ তাঁকে ক্ষমতায় বসাতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল বললে বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না।
২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপির মতো সদ্য ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া জনপ্রিয় দলকে যেখানে সবার কাছে অগ্রহণযোগ্য ফলাফল মেনে নিতে বাধ্য করা হয়, সে ক্ষেত্রে জামায়াতের পক্ষে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝে ওঠা কতটা সম্ভব হবে, তাতে সংশয় রয়েছে। জামায়াত ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি (আইডিএল) নামে মুসলিম লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রথমবার নির্বাচন করে এবং ৬টি আসন পায়। জোটের প্রাপ্ত ভোট ছিল ১৯,৪১,৩৯৪। জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করে ১৯৮৬ সালে এবং ১৩,১৪,০৫৯ ভোট পেয়ে ১০ আসনে জিতে। ১৯৯১ সালে ১৮ আসনে জয়ী হয় এবং ভোট পায় ৪১,৩৬,৬১১টি। এটিই ছিল এযাবতকালে জামায়াতের সর্বোচ্চ ভোট সংগ্রহ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় জামায়াত বেশ চাপের মধ্যে ছিল। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করলেও জামায়াতের প্রার্থী সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪ জন। প্রার্থীসংখ্যার বিবেচনায় জামায়াতের আহরিত ভোটসংখ্যা বেশ ভালো ছিল- ৩২,৮৯,৯৬৭।
২০০৮-এর চেয়ে দেশে ভোটারসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-এ দেশে ভোটারসংখ্যা ছিল ১১,৯৬,৮৯,২৮৯, যা এখন ১২,৭৬,৯৫,১৮৩ অর্থাৎ দুই বছর আগের তুলনায় ৮০ লাখের বেশি ভোট বেড়েছে। এ সময়ের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা যেখানে ২.২৯ শতাংশ বেড়েছে, সে ক্ষেত্রে নারী ভোটার বেড়েছে ৪.১৬ শতাংশ। নারীর চেয়ে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা মাত্র সাড়ে ১৯ লাখ বেশি। তাৎক্ষণিক পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও প্রথমবার ভোটার হয়েছেন, তাদেরসহ ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়স্ক ভোটারের সংখ্যা মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জামায়াতের জন্য ক্ষমতার রাজনীতিতে ভালো না করতে পারার প্রথম বাধা জামায়াতবিরোধী ইসলামি দল ও পীরের মুরিদরা। আওয়ামী লীগের নিজস্ব ভোট এবং তাদের সংরক্ষিত ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে বিবেচিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভোট বাগাতে জামায়াত খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না। আওয়ামী লীগের অবর্তমানে দলটির কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে, আর যারা ভোট দেবে, তারা বিএনপি প্রার্থীকেই ভোট দেবে, অবশ্যই জামায়াতের প্রার্থীকে দেবে না। জামায়াত প্রার্থীরা মাঝারি পথ অবলম্বনকারীদের ভোট টানবে, যারা আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের অত্যাচার, চাঁদাবাজি, খুন-লুণ্ঠন-দখল সহ্য করেছে এবং গত দেড় বছরে বিএনপির মাঝারি নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড দেখে হতাশ হয়ে পড়েছে, তারা জামায়াতকেই তাদের উদ্ধারকারী বিবেচনা করছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী ঘটে। আর মাত্র এক মাস অপেক্ষা করতে হবে।