শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

সীমান্তে গুলিতে আহত শিশু এখন লাইফ সাপোর্টে

কক্সবাজার প্রতিনিধি : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে সীমান্তের এপারের বাংলাদেশ অংশেও। গতকাল রোববার সকালে কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছে বাংলাদেশি এক শিশু। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। একই সময় আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন।

অন্যদিকে রাখাইনের সংঘাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে অনুপ্রবেশের সময় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্যকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গতকাল সকাল থেকে দিনের বিভিন্ন সময়ে হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাদের আটক করা হয়। বিজিবি জানায়, আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে টিকতে না পেরে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিল। পরে বিকেলে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে সীমান্তবর্তী জনপদে ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ ও গুলির শব্দে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় একের পর এক গোলার বিস্ফোরণ এবং শত শত রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে বাড়িঘর কেঁপে ওঠে এবং ছোড়া গুলি চিংড়ি ঘের ও চাষের জমিতে এসে পড়ে। এতে নারী ও শিশুরা আতঙ্কে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

গুলিবিদ্ধ শিশুটির নাম হুজাইফা সুলতানা আফনান (৯)। স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোছন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আফনান নিজ বাড়ির সামনে খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে অবস্থার অবনতি হলে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। শিশুটির বাবা জসিম উদ্দিন জানান, ‘সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে হুজাইফা বাড়ির সামনে খেলছিল। হঠাৎ আরাকান আর্মি বেড়িবাঁধের ওপর থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে আমার মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।’

চমেক হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ জানান, শিশুটির অবস্থা গুরুতর। গুলি তার মুখের এক পাশ দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে প্রবেশ করেছে।

ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায়। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল এবং সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ঘটনাস্থলে গিয়ে জনতাকে শান্ত করলে তারা অবরোধ তুলে নেয়। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাখাইনে আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং মিয়ানমার জান্তার মধ্যে কয়েকদিন ধরে ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছে। এর ধারাবাহিকতায় সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। গতকাল সকালে নাফ নদের বিলাইছরি ও হাসরদ্বীপ এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। সকালের দিকে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে আরাকান আর্মি ড্রোন হামলা চালায়। পরে তারা বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন বেড়িবাঁধ পর্যন্ত চলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।

বিজিবি ও পুলিশ জানায়, সীমান্তে অনুপ্রবেশের সময় আটক হওয়া ৫০ জনের মধ্যে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ ছিল। তাদের মধ্যে আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির ৩ জন, রোহিঙ্গা ইসলামী মাহাসের ১৮ জন এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির ২৯ জন রয়েছে। বিজিবির কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল বলেন, ‘সীমান্তে কয়েকদিন ধরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় পরিস্থিতি থমথমে। অনেক বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে।’