নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্রীয়ভাবে তামাকমুক্ত ভবিষ্যতের লক্ষ্য ঘোষণা করা হলেও নামমাত্র বিনিয়োগ ও সীমিত কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যুক্তিতে দেশে তামাকজাতীয় পণ্য ‘নিকোটিন পাউচ’ উৎপাদনের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এ অনুমোদন প্রচলিত আইন ও সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিল বিভিন্ন মহল। এ নিয়ে উচ্চ আদালত রুলও জারি করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনালকে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক ছাড়পত্র দেয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। পরে নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনে কারখানা স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানিটি বাংলাদেশে ৫৮ লাখ ২০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করবে এবং এতে ৬০ জনের কর্মসংস্থান হবে।
নিকোটিন হচ্ছে তামাকজাত পণ্যের আসক্তি সৃষ্টিকারী মূল উপাদান। নিকোটিন পাউচ হলো নিকোটিন, সুগন্ধি ও অন্যান্য উপাদানের মিশেলে তৈরি ছোট পুঁটলি, যা ঠোঁট ও মাড়ির মাঝখানে রাখতে হয়।
ফিলিপ মরিসকে এ অনুমোদন দেওয়ার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি বিদ্যমান আইন ও আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়। ২০০৫ সালের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার আইন (২০১৩ সালে সংশোধিত) এবং ২০১৫ সালের বিধিমালার আওতায় দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি হয়। ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি নতুন কোনো তামাক কোম্পানি বা তামাকজাত পণ্যের লাইসেন্স না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছে। সেই নীতির ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ই-সিগারেট ও সংশ্লিষ্ট তামাকজাত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে। একই বছরের ১৮ মে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ই-সিগারেট ও ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনডিএস)-সংক্রান্ত কোনো কারখানা স্থাপন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
উৎপাদনকারীরা দাবি করে থাকেন, নিকোটিন পাউচ প্রচলিত সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর। তবে বিদেশি গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদে এটি আরেক ধরনের নিকোটিননির্ভরতা তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, “নিকোটিন পাউচ সাধারণ তামাকের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। এতে আসক্ত ব্যক্তিদের ক্যানসার, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ফুসফুস ও শ্বাসনালির রোগ, এমনকি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন পণ্যের উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া দ্বিচারিতার শামিল।”
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিডা ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) লিখিতভাবে নিকোটিন পাউচ কারখানার অনুমোদন বাতিলের অনুরোধ জানায়। ২৯ মে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে সতর্ক অবস্থানে থাকার আহ্বান জানানো হয়। সর্বশেষ গত ২৫ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন পায়। এতে নতুন তামাকপণ্যের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের পাশাপাশি নিকোটিন পাউচকে তামাকজাত দ্রব্যের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, “ভবিষ্যৎ ব্যবসার স্বার্থে কোম্পানিগুলো নতুন প্রজন্মকে লক্ষ্য করে এই ধরনের পণ্য বাজারে আনছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।”
জনস্বার্থে করা রিট আবেদনের শুনানির পর গত বছরের ১৬ নভেম্বর হাইকোর্ট নিকোটিন পাউচ কারখানার অনুমোদন কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেন, “ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের কারণে দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে। মানুষকে এই অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন বাতিল করা জরুরি।”
বিডার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। বিডার সিনিয়র রিলেশনশিপ ম্যানেজার ফাতিমা তুজ জোহরা বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় এই খাতে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ নয়। তবে বিডা সরকারের স্বার্থবিরোধী কিছু করবে না।”
বেজার সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নজরুল ইসলাম বলেন, “বেজা ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানা নেই।”
ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ম্যানেজার রেজাউর রহমান মাহমুদ বলেন, “নিকোটিন পাউচ সিগারেট, ই-সিগারেট, গুল, জর্দাসহ অন্যান্য তামাকপণ্যের আসক্তি কমাতে সহায়ক।”