শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

সুবিধা পাবে জামায়াত জোট৭৯ আসনে বিএনপির ৯২ বিদ্রোহী প্রার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক : সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও দলের বিদ্রোহ পুরোপুরি থামাতে পারলেন না বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বড় অংশ সরেননি। বহিষ্কার, সতর্কতা ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে তাঁরা নির্বাচনের মাঠে রয়ে গেছেন। এতে সুফল পাবে দলটির প্রধান প্রতদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট। দশ দলীয় জোটে জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী মাত্র একজন। বিএনপি’র ভোট বিভক্ত হলে অনেক আসনের হিসান নিকাশ পাল্টে যাবে। নির্বাচনী যাত্রা সুখকর হবে না ক্ষমতাপ্রত্যাশী প্রধান দল বিএনপি’র।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাত শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৯৮ আসনের মধ্যে ৭৯টি আসনে বিএনপির ৯২ জন নেতা এখনো বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়ে গেছেন। কোনো কোনো আসনে একাধিক বিদ্রোহী রয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

শুরুতে ১১৭ আসনে বিএনপির ১৯০ জনের মতো দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁদের কারও কারও মনোনয়নপত্র বাছাইপর্বে বাতিল হয়েছে। গতকাল অনেকে প্রত্যাহারও করেছেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়া নেতাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ-পদবি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর একজন বিদ্রোহী প্রার্থীর খবর পাওয়া গেছে। তিনি হলেন ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। এ কারণে তাঁকে গত ২৯ ডিসেম্বর দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল গতকাল মঙ্গলবার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। গতকাল ২০ জানুয়ারি ছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ। দুটি আসনে-পাবনা ১ ও ২ আসনের নতুন তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় আছে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত।

বহিষ্কারের পরেও সরেননি তাঁরা দল থেকে বহিষ্কারের পরেও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও সমমনাদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলো থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারা। এর মধ্যে কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে প্রার্থী করেছে। এ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলমের (নীরব) পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগে গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বিএনপির সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানাও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। সেখানে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন রুমিন ফারহানা। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় তাঁকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।

পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য এবং ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি। এ আসনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দিয়ে বিএনপি প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দলের নির্দেশনা অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় হাসান মামুনকে বহিষ্কার করা হয়।

একইভাবে ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তিনি ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করার জন্য গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খাঁন বিএনপিতে যোগ দেন। সাইফুল ইসলাম ফিরোজ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

সিলেট-৫ আসনে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। এ আসন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। মামুনুর রশিদকে ইতিমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনও বিএনপি মিত্র দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমীকে ছেড়ে দিয়েছে। এখানে বিএনপির দুজন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তাঁরা হলেন বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রার্থী হওয়ায় এই দুজনকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।

যশোর-৫ আসনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ মো. ইকবাল হোসেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এ আসনও বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (অনিবন্ধিত দল) নেতা মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি।

বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে। এখানে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলার সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল প্রার্থী হয়েছেন। তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।

গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শরিক দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে একটি আসন ছাড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির। তবে রাজধানী ঢাকায় নাকি বগুড়ায়—সেটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এরই মধ্যে মান্না অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি ঢাকা-১৮ ( উত্তরা-বিমানবন্দর) ও বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দুটি আসনেই তাঁর প্রার্থিতা রয়েছে। দুটিতেই বিএনপির প্রার্থীও রয়েছে।

ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে ও বগুড়া-২ আসনে বিএনপির নেতা মীর শাহে আলমকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাঁদের দুজনের প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে।

বগুড়া-২ আসনে সমর্থন দেওয়ার পরেও সেখানে বিএনপি প্রার্থী দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন মাহমুদুর রহমান মান্না। একই সঙ্গে ঢাকা-১৮ আসনের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা জানান। এই দুটি আসনের কথা উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি দুই জায়গাতেই লড়াই করব।’