ফিচার ডেস্ক : সংগীতশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণবের একটি গানে আছে, ‘হারিয়ে গিয়েছি, এই তো জরুরি খবর।’ মানুষ চলতে চলতে পথ হারিয়ে ফেলতেই পারে—তা জীবনযাত্রার গলিতেই হোক কিংবা অজানার উদ্দেশ্যে ভ্রমণে। তবে হারিয়ে যাওয়ার এই খবর সব সময় সুখকর হয় না। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা সম্পূর্ণ অচেনা জায়গাতেও কেবল নিজেদের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে অনায়াসে পথ খুঁজে নিতে পারেন; যেন তাঁদের মাথায় কাজ করছে কোনো অদৃশ্য মানচিত্র। অন্যদিকে অনেকেই পরিচিত রাস্তাতেও খেই হারিয়ে ফেলেন।
ভালো নেভিগেশন বা দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা কেবল ভ্রমণ বা ক্যারিয়ারের জন্যই নয়, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রশ্ন হলো, এই ক্ষমতা কি জন্মগত, নাকি অর্জনযোগ্য? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিক চেনার দক্ষতা কোনো জাদুর কাঠি নয়, বরং নিয়মিত চর্চার বিষয়। মস্তিষ্ককে চেনা ছকের বাইরে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করলে জিপিএস ছাড়াই হয়ে ওঠা যায় আত্মবিশ্বাসী অভিযাত্রী।
মস্তিষ্কের মানচিত্র ও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্কের নমনীয়তা বা ‘নিউরোপ্ল্যাস্টিসিটি’র কারণে যেকোনো বয়সেই দিক চেনার দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। মানুষের দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা মূলত মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানেই স্মৃতির পাশাপাশি তৈরি হয় একটি ‘কগনিটিভ ম্যাপ’ বা মানসিক মানচিত্র। লন্ডনের ক্যাবচালকদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের পর বছর শহরের অলিগলি মনে রাখার ফলে তাঁদের হিপোক্যাম্পাস সাধারণ মানুষের তুলনায় বড় হয়ে গেছে। অর্থাৎ মস্তিষ্ককে যত বেশি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হবে, এটি তত বেশি শক্তিশালী হবে।
শৈশবের প্রভাব ও সামাজিক ভুল ধারণা
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা শহরের বাইরে বা জটিল নকশার জনপদে বড় হয়েছেন, তারা পরিণত বয়সে পথ চেনায় বেশি পারদর্শী হন। শৈশবে স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরি ও বিচিত্র পরিবেশ দেখার সুযোগ পাওয়া শিশুদের ‘স্প্যাশিয়াল মেমোরি’ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। প্রচলিত একটি সামাজিক মিথ হলো, পুরুষদের তুলনায় নারীদের দিক চেনার ক্ষমতা কম। বাস্তবে অনেক সমাজে মেয়েদের ছোটবেলা থেকে একা ঘোরাঘুরি বা নেভিগেশন দক্ষতা চর্চার সুযোগ কম দেওয়া হয়। এই স্টিরিওটাইপের কারণে নারীরা আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি বোধ করেন, যদিও পরীক্ষায় তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের সমান স্কোর করেন। অন্যদিকে অনেক পুরুষ নিজেদের দক্ষতাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে বিপত্তি ডেকে আনেন।
দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা বাড়ানোর ৮ ধাপ
প্রযুক্তির যুগে জিপিএস থাকলেও ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়া বা সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তখন নিজের দক্ষতাই হবে ভরসা। দিক চেনার ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ৮টি ধাপ হলো—
১. পূর্বপরিকল্পনা: যাত্রার আগে ম্যাপ বা ‘স্ট্রিট ভিউ’ দেখে রাস্তার সঙ্গে পরিচিত হন।
২. পরিবেশের সংকেত লক্ষ করা: সূর্যের অবস্থান, বাতাসের গতি বা রাস্তার ঢাল দেখে দিক বোঝার চেষ্টা করুন। ৩. ল্যান্ডমার্ক চেনা: উঁচু ভবন, বড় গাছ বা বিশেষ দোকানকে মাইলফলক হিসেবে মনে রাখুন।
৪. পেছন ফিরে তাকানো: মাঝেমধ্যে পেছনে ফিরে দেখে নিন, ফিরে আসার সময় কোন বাঁক কেমন দেখাবে।
৫. স্মৃতির সঙ্গে জায়গা যুক্ত করা: নির্দিষ্ট স্থানে কোনো ঘটনা বা স্মৃতি মনে রাখুন।
৬. ছবি তোলা: গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোতে স্থির ছবি তুলুন, ভিডিও নয়।
৭. পথ পরিবর্তন: প্রতিদিন একই পথে না গিয়ে মাঝেমধ্যে ভিন্ন পথ বেছে নিন।
৮. পর্যাপ্ত ঘুম ও স্মৃতিচারণা: অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমান এবং দিন শেষে যাত্রাপথ মনে মনে কল্পনা করুন।