মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৭ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

এপস্টেইনের গোপন ইমেইলে ব্রাউনের পতনের ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রকাশ্যে লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের অনুগত সহযোগী। নিজেকে তিনি সব সময় প্রধানমন্ত্রী ব্রাউনের বিশ্বস্ত ডেপুটি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। কিন্তু ব্রাউন সরকারের শেষ দিনগুলোতে জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ইমেইল বিনিময় ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

এই ইমেইলগুলো পাওয়া গেছে এপস্টেইন ফাইলস থেকে। ২০১০ সালের ৯ মে আদান–প্রদান হওয়া বার্তাগুলো সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ। সেখানে দেখা যায়, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এপস্টেইন ম্যান্ডেলসনকে লিখেছেন, ‘বিদায় নেওয়ার সময় কি হয়ে গেছে।’ জবাবে ম্যান্ডেলসনও স্বীকার করেন, গর্ডন ব্রাউনের বিদায়ের সময় এসে গেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তখন গির্জায় গিয়েছিলেন।

এই বার্তাগুলো ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পরপরই লেবার পার্টির ভেতরে ক্ষমতা ধরে রাখার গোপন তৎপরতার চিত্র তুলে ধরে। ওই নির্বাচনে লেবার পার্টি পরাজিত হলেও কনজারভেটিভ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনের চেষ্টা হয়। কিন্তু দুই দিন পরই গর্ডন ব্রাউন পদত্যাগ করেন।

এপস্টেইন ফাইলস থেকে জানা যায়, নির্বাচনের আগেই ব্রাউন ও তাঁর অর্থমন্ত্রী অ্যালিস্টার ডার্লিংকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছিল। একপর্যায়ে এপস্টেইনের ধারণা ছিল, লর্ড ম্যান্ডেলসন নিজেই ব্রাউনের জায়গায় নেতা হতে পারেন, যদিও সে সময় তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন না।

ইমেইলগুলো পড়লে প্রশ্ন জাগে, ম্যান্ডেলসন আসলে কোন পক্ষের ছিলেন। তাঁর এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ দেখে মনে হয়, তিনি একসঙ্গে দুই পক্ষের জন্য কাজ করছিলেন—একদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ধনী অর্থলগ্নিকারী, যিনি তখন শিশু যৌন অপরাধে দণ্ডিত।

লেবার সরকারের শেষ কয়েক মাসে ম্যান্ডেলসন নিয়মিতভাবে এপস্টেইনকে সরকারের ভেতরের খবর জানাতেন। ডাউনিং স্ট্রিটে কী হচ্ছে, কার সঙ্গে কী আলোচনা চলছে—সবকিছুর বিবরণ তিনি এপস্টেইনকে দিতেন। এদিকে এপস্টেইনের পরামর্শ ছিল একটাই—গর্ডন ব্রাউনকে সরাতে হবে।

গর্ডন ব্রাউনকে সরানোর চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল আরও আগে, ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর। ওই দিনই ম্যান্ডেলসনকে ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে সরকারে ফিরিয়ে আনা হয়। টনি ব্লেয়ারের শাসনামলে দুইবার পদত্যাগে বাধ্য হওয়া এই ব্লেয়ারপন্থী রাজনীতিককে ফিরিয়ে এনে ব্রাউন তাঁর দুর্বল সরকারকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন।

সেদিনই এপস্টেইন ম্যান্ডেলসনকে অভিনন্দন জানান। বানান ও ভাষায় ভুল থাকলেও বার্তার অর্থ ছিল স্পষ্ট। তিনি লেখেন, ‘এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ। আর্থিক সংকট ও ইন্টারনেট যুগের বাস্তবতায় সরকার পরিচালনার ধরন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।’

এপস্টেইন আরও লেখেন, ‘গর্ডন ব্রাউন একজন বৃদ্ধ মানুষের মতো ভাবেন এবং পুরোনো সমাধান দিয়ে নতুন সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়।’ তাঁর মতে, ম্যান্ডেলসনই হবেন নতুন ধরনের লেবার রাজনীতির স্থপতি। পরের বছরের জুনে ম্যান্ডেলসন কার্যত উপ–প্রধানমন্ত্রী হন এবং একই সঙ্গে ব্যবসায় মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করতে থাকেন। এদিকে এপস্টেইন তখন যুক্তরাষ্ট্রে শিশু যৌন অপরাধে কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন।

তবে জেলে থাকলেও সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। মুক্তির কয়েক সপ্তাহ আগে ম্যান্ডেলসন নিউইয়র্কে এপস্টেইনের বিলাসবহুল টাউনহাউসে যান। এমনকি কারাগারে থেকেও এপস্টেইন তাঁর ধনী বন্ধুদের জন্য ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডস ও ডাউনিং স্ট্রিটে সফরের ব্যবস্থা করতেন, যা ম্যান্ডেলসনের মাধ্যমে হতো।

২০০৯ সালের অক্টোবরে এপস্টেইন মজা করে—নাকি গুরুত্ব দিয়েই—ম্যান্ডেলসনকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি লেখেন, রাজপরিবারের কারও সঙ্গে বিয়ে হলে এবং পরে তালাক হলে পিয়ারেজ বাতিল হয়ে যেতে পারে, তখন ম্যান্ডেলসনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ খুলে যাবে।

নভেম্বরে এসে এপস্টেইন আরও স্পষ্টভাবে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তিনি গর্ডন ব্রাউনের পরিবর্তে ম্যান্ডেলসন ও ডেভিড মিলিব্যান্ডকে নিয়ে যৌথ নেতৃত্বের কথা বলেন। তাঁর ধারণা ছিল, ভোটাররা আসলে ম্যান্ডেলসনের পক্ষেই ভোট দেবে।

একই সময়ে এপস্টেইনের আরেক লক্ষ্য ছিল অর্থমন্ত্রী অ্যালিস্টার ডার্লিংকে সরানো। ডার্লিং তখন বড় ব্যাংকগুলোর বিপুল বোনাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এপস্টেইনের কাছে নিজের ঘনিষ্ঠ মানুষকে অর্থমন্ত্রী বানানো ছিল সুবিধাজনক। তিনি ম্যান্ডেলসনকে লেখেন, এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। জবাবে ম্যান্ডেলসন জানান, প্রধানমন্ত্রী এতে আপত্তি জানিয়েছেন এবং তাঁকে সেটাই মেনে নিতে হচ্ছে।

পরবর্তী সময়ে এপস্টেইন বারবার ব্রাউনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ম্যান্ডেলসনকে উৎসাহিত করেন। কিন্তু ম্যান্ডেলসন লেখেন, প্রধানমন্ত্রী সহজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং সামান্য ইঙ্গিত পেলেই প্রতিক্রিয়া দেখান।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এপস্টেইন তাঁকে সরাসরি বলেন, ‘গর্ডন ব্রাউনের অবস্থান আর টেকসই নয়।’ ম্যান্ডেলসন জবাবে লেখেন, তিনি যদি সরকারে থাকেন, মানুষ বলবে তিনিই বড় নেতা এবং পুরো নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব তাঁর ওপর পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নষ্ট করে ফেলতে পারেন।

এপস্টেইন সতর্ক করে দেন, শুধু প্রধানমন্ত্রীর বক্তা হয়ে থাকলে শেষ পর্যন্ত তাঁর গায়েই দায় চাপবে। ম্যান্ডেলসন তখন লেখেন, গর্ডন ব্রাউন ‘সত্য সহ্য করতে পারেন না’ এবং ‘তাঁর দীর্ঘ সময় মানসিক চিকিৎসা দরকার।’

নির্বাচনের ঠিক আগে এপ্রিল মাসে ম্যান্ডেলসন লেখেন, ব্রাউনকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা কঠিন। পরদিন তিনি জানান, রচডেলে এক বৃদ্ধ নারী ভোটারকে অভিবাসন নিয়ে প্রশ্ন করার কারণে ‘গোঁড়া’ বলার ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে এবং এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

নির্বাচনের দিন ম্যান্ডেলসন লেখেন, লেবার পার্টি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের জন্য প্রার্থনা করছে। নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে যখন সারা দেশ উৎকণ্ঠায়, তখন ম্যান্ডেলসন নিয়মিতভাবে এপস্টেইনকে আলোচনার খবর জানাচ্ছিলেন।

মে মাসের শুরুতে এপস্টেইন তাঁকে মনে করিয়ে দেন, মানুষ শেষটাই মনে রাখে। জবাবে ম্যান্ডেলসন লেখেন, সামনে কেবল ধ্বংসই দেখা যাচ্ছে। ১০ মে তিনি লেখেন, অবশেষে গর্ডন ব্রাউনকে সরে যেতে রাজি করানো গেছে। পরদিন তিনি নিশ্চিত করেন, দিনের শেষে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করছেন এবং ‘সব শেষ হয়ে গেছে।’

এভাবেই নিউ লেবার প্রকল্পের সমাপ্তি ঘটে। একই সঙ্গে শেষ হয় লর্ড ম্যান্ডেলসনের মন্ত্রিসভা জীবন। তবে এই পতনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁর ব্যক্তিগত ও আর্থিক জীবনের নতুন অধ্যায়।