বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২২ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

স্বচ্ছতার নতুন নজির: অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ

মুক্তবাণী ডেস্ক: অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হয়েছে । আজ মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ বিবরণী জনসমক্ষে আনা হয় । প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর ২০২৪ সালের ৩০ জুন এবং ২০২৫ সালের ৩০ জুনের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা হলো ।

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারের সব উপদেষ্টার সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হবে। প্রধান উপদেষ্টা তখন বলেছিলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে এবং সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করবেন। সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় আজকের এই বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ স্বাক্ষরিত এই প্রতিবেদনে উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত সম্পদের পাশাপাশি তাঁদের স্বামী বা স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে । সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে অনেক উপদেষ্টার সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হ্রাসও পেয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পদের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ জুন তারিখে তাঁর মোট পরিসম্পদ ছিল ১৩ কোটি ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৩ টাকার আর্থিক সম্পদসহ মোট ১৪ কোটি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা । ২০২৫ সালের ৩০ জুনে এসে তাঁর মোট পরিসম্পদ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ০৬৫ টাকায় । তাঁর এই সম্পদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রজ্ঞাপনে সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী বা মেয়াদী আমানতে বৃদ্ধি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শেয়ারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে । তবে একই সময়ে তাঁর স্ত্রী ড. আফরোজী ইউনূসের সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৪ টাকা থেকে কমে ১ কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে ।

সম্পদ বেড়েছে যাদের

সম্পদ বৃদ্ধির তালিকায় থাকা অন্য উপদেষ্টাদের মধ্যে ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মোট পরিসম্পদ ২০২৪ সালের ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা হয়েছে । তাঁর স্ত্রী পারভীন আহমেদের সম্পদও ৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে । উপদেষ্টা জনাব ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সম্পদও এই এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে তাঁর সম্পদ ছিল ১৫ কোটি ৯ লাখ ১৩ হাজার ১০২ টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১৬ কোটি ২২ লাখ ৯৫ হাজার ৪৮৩ টাকা । ব্যাংক আমানত থেকে প্রাপ্ত মুনাফা এবং ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হতে প্রাপ্ত আয়কে তাঁর এই সম্পদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে । ড. আসিফ নজরুলের ক্ষেত্রেও সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র দেখা যায়। ২০২৪ সালে তাঁর মোট সম্পদ ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ৪৩৩ টাকা, যা ২০২৫ সালে ১ কোটি ৬০ লাখ ৯৮ হাজার ২৩২ টাকায় উন্নীত হয়েছে । তাঁর স্ত্রী মিজ শীলা আহমেদের সম্পদও ২ কোটি ১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা হয়েছে ।

উপদেষ্টাদের মধ্যে বড় অঙ্কের সম্পদের মালিকদের তালিকায় থাকা শেখ বশিরউদ্দীনের হিসাবও প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিতভাবে এসেছে। ২০২৪ সালে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৮৪২ টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৯১ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ৮৯৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে । তাঁর সম্পদের সিংহভাগই হলো স্থাবর বা নন-ফাইনান্সিয়াল সম্পদ, যার পরিমাণ ৮২ কোটি ২০ লাখ টাকারও বেশি । তাঁর স্ত্রী মিজ ইফসিয়া মাহিনের সম্পদও ২ কোটি ৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা হয়েছে । উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদের সম্পদও ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা হয়েছে এবং তাঁর স্বামী জনাব হুমায়ুন কাদের চৌধুরীর সম্পদ ৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা হয়েছে ।

সম্পদ কমেছে যাদের

কিছু উপদেষ্টার ক্ষেত্রে সম্পদের পরিমাণ হ্রাসের চিত্রও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সম্পদের হিসাব। ২০২৪ সালের ৩০ জুনে তাঁর মোট পরিসম্পদ ছিল ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ০৫৫ টাকা, যা ২০২৫ সালের ৩০ জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার ৯২৪ টাকায় । অর্থাৎ এক বছরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। তাঁর স্বামী জনাব আবু বকর সিদ্দিকের সম্পদ অবশ্য সামান্য বেড়ে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা হয়েছে । উপদেষ্টা জনাব সুপ্রদীপ চাকমার সম্পদও ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা থেকে কমে ১ কোটি ৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে । তাঁর স্ত্রী মিজ নন্দিতা চাকমার সম্পদও ৬৩ লাখ টাকা থেকে কমে ৫৮ লাখ টাকা হয়েছে । উপদেষ্টা জনাব মোঃ তৌহিদ হোসেনের স্ত্রী মিজ জাহান আরা সিদ্দিকীর সম্পদও ৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা থেকে কিছুটা কমে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হয়েছে ।

ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্যে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মোঃ মাহফুজ আলমের সম্পদের তথ্যও এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুনে আসিফ মাহমুদের কোনো টিআইএন ছিল না বলে তাঁর ওই সময়ের সম্পদের হিসাব পাওয়া যায়নি, তবে ২০২৫ সালের ৩০ জুনে তাঁর মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৭ টাকা । একইভাবে মোঃ মাহফুজ আলমের ক্ষেত্রেও ২০২৪ সালে টিআইএন ছিল না, তবে ২০২৫ সালে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৯ টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । তাঁদের উভয়ের ক্ষেত্রেই সম্পদের পরিমাণ ২০২৪ সালের একটি প্রতীকী ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে দেখা যায় ।

বিদেশে সম্পদের মালিকানার বিষয়টিও এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ড. খলিলুর রহমান, যিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর যৌথ পরিসম্পদ দেখানো হয়েছে ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫০ ইউএস ডলার । প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বাইরে ইমারত, ফ্ল্যাট এবং অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে তাঁর এই সম্পদ রয়েছে । এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লেঃ জেঃ আব্দুল হাফিজের (অবঃ) বাংলাদেশের বাইরে ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪৭ হাজার ৪২৮ টাকার সম্পদ রয়েছে, যা তিনি জাতিসংঘে কর্মকালীন আয় হতে ফ্ল্যাট হিসেবে ক্রয় করেছেন বলে জানানো হয়েছে । আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত জনাব লুৎফে সিদ্দিকী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি কোনো সরকারি সুবিধাদি গ্রহণ করেন না ।

অন্যান্য উপদেষ্টাদের মধ্যে অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং তাঁর স্ত্রী অধ্যাপক তাসনিম আরেফা সিদ্দিকীর মোট সম্পদ যথাক্রমে ৭ কোটি ৫৭ লাখ এবং ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা । উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সম্পদ ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর সম্পদ ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা । উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সম্পদ ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং তাঁর স্বামী কে এম আসাদুজ্জামানের সম্পদ ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা । অধ্যাপক ডাঃ বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের সম্পদ ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং তাঁর স্ত্রী ডাঃ রমা সাহার সম্পদ ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপদেষ্টাদের সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে ব্যাংক আমানতের মুনাফা এবং স্থাবর সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই দীর্ঘ এবং বিস্তারিত সম্পদ বিবরণী প্রকাশের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বলে ধারণা করা হচ্ছে।