আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জেন-জি বিপ্লবে অশান্ত নেপালে চলছে সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী ভোট গণনা। বিপ্লবের জনপ্রিয় মুখ বালেন্দ্র শাহ ভোটে এগিয়ে আছেন বড় ব্যবধানে। ব্যবধান বজায় থাকলে এই র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বালেন্দ্র শাহ ওরফে বালেন শাহই হতে পারেন দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে রাজধানী কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নেপালি কংগ্রেসের গগন থাপা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সঙ্গে। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে এগিয়ে আছে শাহর মধ্যপন্থী দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি)। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নেপালি কংগ্রেস এবং তৃতীয় স্থানে ইউএমএল।
চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। পাহাড়ি দেশ নেপালে ভোট গণনা ঐতিহ্যগতভাবেই ধীরগতির। দুর্গম অঞ্চলের ব্যালট বাক্স সংগ্রহে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয় বলে ফলাফল জানতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ২০২২ সালের নির্বাচনেও চূড়ান্ত ফল প্রকাশে দুই সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছিল।
কে এই বালেন শাহ
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ ‘বালেন’ নামেই পরিচিত। পেশায় একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হলেও তিনি নেপালের হিপ-হপ জগতের জনপ্রিয় মুখ। তাঁর গাওয়া গানগুলোতে সামাজিক সচেতনতার বিষয় উঠে এসেছে। ইউটিউবে তাঁর ‘বলিদান’ গানটির ভিউ ১ কোটিরও বেশি।
গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে তরুণদের কাছে শাহর জনপ্রিয়তা বহুগুণ বেড়ে যায়। দুর্নীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ওই বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন। এর জেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি ওলি পদত্যাগ করেন। তবে এবারের নির্বাচনে তিনি আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিক্ষোভ চলাকালে শাহ আন্দোলনকারীদের সমর্থন দেন এবং প্রকাশ্যে ওলিকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন। এ ধরনের মন্তব্যের কারণে অনেকেই মনে করেন, তিনি দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নন। মেয়র থাকাকালেও সড়ক উচ্ছেদ ও লাইসেন্সবিহীন ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযানে মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়েন।
এবার তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ওলির শক্তিশালী ঘাঁটি ‘ঝাপা-৫’ আসনে। ভোট গণনায় সেখানে শাহ এগিয়ে আছেন। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলেছেন। ভোটের দিনও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। কালো সানগ্লাস পরে সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে চলে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেক তরুণ ভোটার মনে করছেন, শাহর তারুণ্য ও উদ্দীপনাই এখন দেশের প্রয়োজন।
ভোট হয়েছে যেভাবে
নির্বাচনে ভোটাররা প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও পার্লামেন্টের ২৭৫ জন সদস্য নির্বাচন করেছেন। ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব—এই দুই পদ্ধতির মিশ্রণে ভোট নেওয়া হয়েছে। ১৬৫ জন সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন এবং বাকি ১১০ জন নির্বাচিত হয়েছেন দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে। প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। কর্মকর্তাদের ধারণা, এবার প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন
গত বছরের গণ-আন্দোলনের পর এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে ‘পুরানো বনাম নতুনের’ লড়াই হিসেবে। তরুণ ভোটাররা, যাদের মধ্যে ৮ লাখ এবার প্রথমবার ভোট দিয়েছেন, ছিলেন সব দলের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের মন জয় করার চেষ্টা করেছে।
গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে নেপালে মূলত তিনটি দলের প্রাধান্য দেখা গেছে। এবার কোনো বড় জোট গঠন হয়নি। ফলে ভোটারদের কাছে দল ও প্রার্থীর প্রকৃত জনপ্রিয়তা স্পষ্ট হচ্ছে। নতুন দল ও নতুন মুখের উপস্থিতিও বেশি। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বলেন্দ্র শাহ যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হন, তবে তা হবে নেপালের রাজনীতির জন্য এক অভাবনীয় মুহূর্ত। কয়েক দশকের পুরনো মুখ আর অস্থিতিশীল জোট সরকারের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এটি হতে পারে এক বিশাল পরিবর্তন।