মুক্তবাণী রিপোর্ট : দেশের প্রধান ফসল বোরো। আর এখন বোরো ধানের ভরা মৌসুম। কিন্তু বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফেব্রুয়ারি থেকে মে সময়ে জমিতে নিয়মিত এক দিন পরপর সেচ দিতে হয়। এলাকাভেদে ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত বোরো ধানের চাষাবাদ হলেও ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বোরো জমি পুরোপুরি সেচনির্ভর থাকে। দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। আর ওসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব। ফসল বাঁচাতে কৃষকরা এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছেন। ডিজেল মিলছে না। কিন্তু বোরো ধানের জমিতে সেচ না দিলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংঙ্কা দেখা দিয়েছে । দেশের সর্বত্রই এখন কৃষকরা সেচের জন্য ডিজেল জোগার নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে রবি মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচনির্ভর ফসলের চাষ হয়। চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর। তার মধ্যে ৮ মার্চ পর্যন্ত ৪৮ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। তার মধ্যে শুধু রংপুর অঞ্চলেই পাঁচ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, যার ৩৫-৪০ শতাংশ পুরোপুরি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে সেচের জ্বালানির সংকট নেই। তেলের অভাবে কোথাও সেচকাজ ব্যাহত হয়নি। সরকার বলছে জ্বালানির জন্য বাংলাদেশ এখন আর এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতোমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবু বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আর বোরো উৎপাদন কমে গেলে হুমকির মুখে পড়তে পারে খাদ্য নিরাপত্তা। তখন চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ পাম্পেই সীমিত পরিমাণে ডিজেল দেয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার ড্রাম বা জারিকেনে তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ বোরো উৎপাদন নিশ্চিতে কৃষির জন্য আলাদা ডিজেল বরাদ্দ, ড্রাম ব্যবহারকারীদের জন্য তেল বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশনা, মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ডিজেলে ভর্তুকি ও বিদ্যুৎচালিত সেচ সমপ্রসারণ জরুরি। কারণ বোরো থেকে ৬০ শতাংশ চাল আসে। আর তার পুরোটাই সেচনির্ভর। সংকট নিরসনে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি। কৃষকের কাছে সরাসরি ডিজেল বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ কৃষক পাম্পে গেলে এক থেকে দুই লিটার তেল দেয়া হয়। যা দিয়ে জমিতে সেচ দিতে গেলে কিছুই হয় না। মূলত ড্রাম বা জারিকেনে তেল বিক্রির স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পাম্পগুলো কৃষকদের তেল দিচ্ছে না।
সূত্র আরো জানায়, বোরো আবাদের মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশের সেচে শ্যালো পাম্প ব্যবহার হয়। বাকিটা গভীর নলকূপ ও লো-লিফট পাম্প দিয়ে সেচ হয়। দেশে চলমান প্রায় ১৪ লাখ শ্যালো পাম্পের মধ্যে প্রায় ১১ লাখই ডিজেলে চলে। বাকি লাখ তিনেক বিদ্যুৎচালিত। সেগুলো বেশ কিছুর আবার স্ট্যান্ডবাই ডিজেল ইঞ্জিনও রাখতে হয়, যাতে প্রচণ্ড গরমের সময় বোরো ধানের থোড় আসার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলেও অতি আবশ্যকীয় সেচকাজ অব্যাহত রাখা যায়। একটি শ্যালো পাম্প চালাতে পুরো বোরো মৌসুমে গড়পড়তা ৩০০ লিটার ডিজেল লাগে। তবে তা জমির পরিমাণ ও মাটিভেদে কমবেশি হতে পারে। জাতীয় খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধান বোরো ফসলের প্রতি যে কোনো মূল্যে বাড়তি মনোযোগ জরুরি। খাদ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে।
এদিকে বোরো সেচে ডিজেল সঙ্কট প্রসঙ্গে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, কোথাও তেলের সমস্যা নেই। তবে ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে কিনা কৃষকের মধ্যে এমন আতঙ্ক কাজ করছে। সেজন্যই পাম্পগুলোতে ভিড় করছে। তবে তেলের অভাবে দেশের কোনো জমিতে সেচ দেয়া যায়নি এমন নজির নেই। মাঠপর্যায়ে সেচের জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম জানান, মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, গ্রীষ্মের তাপদাহ ও সেচের চাপের কারণে ডিজেল কিংবা বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি দেখা দিলে সরকার কৃষি খাতকেই অগ্রাধিকার দেবে। কৃষির সেচ কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা হচ্ছে।