আন্তর্জাতিক ডেস্ক : লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ের দাবি জানিয়েছে ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনায় ‘খেলা’ করার চেষ্টা করলে তা মেনে নেওয়া হবে না। এতে পাকিস্তানে পরিকল্পিত যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দুই পক্ষের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে কীভাবে এগোনো হবে সে বিষয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ইসলামাবাদ থেকে এএফপি জানায়, ইসলামাবাদে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের ভান্স বলেন, ‘ইরান যদি আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসতে চায়, তাহলে আমরা অবশ্যই ইতিবাচক সাড়া দেব।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি তারা আমাদের সঙ্গে খেলা করতে চায়, তাহলে আলোচক দল তাতে সাড়া দেবে না।’
এর কিছুক্ষণ পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দুইটি শর্ত উত্থাপন করেন লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ছাড়। তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন, এই শর্তগুলো ‘আলোচনা শুরুর আগেই পূরণ করতে হবে’ এবং এগুলো ‘পক্ষগুলোর মধ্যে আগেই সম্মত হয়েছিল’, কিন্তু এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশে ইরানের জব্দ সম্পদের পরিমাণ ১০০ থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি ডলার) হতে পারে বলে আগে জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আলেনা দোহান।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসলামাবাদের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্য চলাচল- এই দুটি স্পর্শকাতর বিষয় প্রাধান্য পাবে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে তেহরান লেবাননে ইসরাইলি হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, সেটিও যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় পড়া উচিত।
শুক্রবার ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘আলোচনায় ইরানের হাতে কোনো তাস নেই, শুধু আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহার করে স্বল্পমেয়াদি চাঁদাবাজি ছাড়া।’
পাকিস্তান আগে জানিয়েছিল, শুক্রবার থেকেই আলোচনা শুরু হবে। তবে ভ্যান্স শনিবারের আগে ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা নয়।
ইসলামাবাদের সম্ভাব্য আলোচনাস্থল সেরেনা হোটেল ঘিরে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ‘ইসলামাবাদ টকস’ শিরোনামে ব্যানার ও ডিজিটাল সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে।
‘শুধুই শব্দ’ : তেহরানের নাগরিকের সন্দেহ
তেহরানের এক ৩০ বছর বয়সী বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, আলোচনার সফলতা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তার ভাষায়, ট্রাম্পের বেশিরভাগ বক্তব্যই ‘শুধুই শব্দ আর অর্থহীনতা’।
তিনি বলেন, ‘তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে একটি চুক্তিতে বাধ্য করতে চান- এটাই তার উদ্দেশ্য।’
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হরমুজ প্রণালী দিয়ে খুব কমসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে, যদিও স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও সার এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যই ছিল এমন একটি সংঘাতের অবসান ঘটাতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, যা ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণ নিয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে।
তেহরানের আরেক বাসিন্দা ‘শেইদা’ বলেন, ‘আমি যেমন আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ভয় পাচ্ছি, তেমনি এই শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার ভয়ও পাচ্ছি।’
লেবানন ইস্যুতে সমান্তরাল উত্তেজনা
শুক্রবার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাবাতিয়েতে ইসরাইলি হামলায় ১৩ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। একই দিনে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে প্রায় ৩০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।
হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা ইসরাইলের আশদোদ নৌঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং বৈরুতের ওপর হামলার’ জবাব।
এর আগে বুধবার লেবাননে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় হামলায় ৩৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বাস দিয়েছেন, লেবাননে হামলা কিছুটা ‘নি¤œমাত্রায়’ আনা হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
একজন পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলো ‘ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে’-এর পর বৈরুতে নতুন করে হামলা ঠেকাতে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লেবাননে হিজবুল্লাহর ৪,৩০০টির বেশি অবস্থান ধ্বংস করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (এফএও) সতর্ক করে বলেছে, লেবাননে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে; মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘœ এতে বড় ভূমিকা রাখছে।