আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ৫৭তম দিনে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা আবারও ধুলোয় মিশে গেছে। পুরো দিনটি ছিল নাটকীয় ঘটনার এক অনন্য সংমিশ্রণ — সকালে আলোচনার আশা, বিকেলে সেই আশার বিনাশ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানে প্রায় ২০ ঘণ্টা কাটিয়ে ইসলামাবাদ ছেড়ে ওমানের রাজধানী মাসকাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। আর ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে তাঁর দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের পাকিস্তান সফর বাতিল করে দিয়েছেন। আর ইরান বলছে যুক্তরাষ্ট্র এখন চলমান যুদ্ধ থেকে ‘সম্মানজনক’ প্রস্থানের পথ খুঁজছে। অন্যদিকে, ৫৭ দিনের বিরতির পর ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল শুরু হয়েছে।
পাকিস্তানে কূটনীতির নাটক: আশা থেকে হতাশা
শুক্রবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একটি ছোট দল নিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছান। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তাঁকে নূর খান বিমানঘাঁটিতে স্বাগত জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়। প্রায় ২০ ঘণ্টার এই বৈঠকে আরাগচি যুদ্ধ শেষে ইরানের “মূলনীতিগত অবস্থান” ও শর্তগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তিনি সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের “মূলনীতিগত অবস্থান” উপস্থাপন করেছেন এবং লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার কড়া সমালোচনা করেছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে জানানো হয়, এই সফরের উদ্দেশ্য “দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে অংশীদারদের সাথে নিবিড় সমন্বয় এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা।” তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি পরিষ্কার করে জানান, মার্কিন দূতদের সঙ্গে কোনো সরাসরি বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।
তাসনিম নিউজ এজেন্সি ও ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত মুখপত্র “নূর নিউজ” উভয়ই জানিয়েছে, “আমেরিকানদের সাথে কোনো আলোচনা এজেন্ডায় নেই।” আরাগচি পাকিস্তানের পর ওমান ও রাশিয়া সফরও করবেন বলে জানা গেছে।
শুক্রবার রাতে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট ফক্স নিউজকে নিশ্চিত করেছিলেন যে স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার শনিবার সকালে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দেবেন। লেভিট বলেছিলেন, “আমরা আশাবাদী যে এটি একটি ফলপ্রসূ আলোচনা হবে এবং একটি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাবে।” মার্কিন পক্ষ জানিয়েছিল, ইরানই এই বৈঠকের অনুরোধ করেছে।
তবে শনিবার বিকেলে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। আরাগচি ইসলামাবাদ ছেড়ে ওমানের পথে রওনা দেওয়ার পরপরই ট্রাম্প সফর বাতিলের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া ফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের কাছেই সব তাস আছে। তারা চাইলে যেকোনো সময় আমাদের ডাকতে পারে। কিন্তু শুধু কথা বলার জন্য আমরা আর ১৮ ঘণ্টার ফ্লাইট করব না। এছাড়া তাদের ‘নেতৃত্বের’ মধ্যে প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভ্রান্তি চলছে। আমি কিছুক্ষণ আগেই আমার লোকদের বললাম — না, তোমরা এই ১৮ ঘণ্টার ফ্লাইট আর করবে না।”
ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন যে ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে “প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ কোন্দল” চলছে এবং তারা “বিভক্ত।” এই দাবি খণ্ডন করতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই একটি সমন্বিত বার্তায় ইরানের নেতৃত্বের ঐক্য প্রদর্শন করেছেন। তারা ট্রাম্পের দাবিকে “অসার ও ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের এই মন্তব্যকেই তাদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বলে জানিয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন যে আলোচনার দ্বিতীয় রাউন্ড নিয়ে ইরান সম্মত হয়েছে কিনা — সে বিষয়ে তারা কিছু বলতে রাজি নন।
ইরানের উপর ক্রমশ তীব্র হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ
যুদ্ধের ৫৭তম দিনে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে আর্থিক চাপ আরও তীব্র করেছে। মার্কিন কোষাধ্যক্ষ স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে সংযুক্ত ৩৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩,৭০০ কোটি বাংলাদেশি টাকা) মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পদ জব্দ করেছে। একইসাথে ইরানি তেল পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট চীনভিত্তিক একটি বড় শোধনাগার এবং প্রায় ৪০টি শিপিং কোম্পানি ও ট্যাংকারের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বেসেন্ট স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানি তেলের জন্য যেকোনো ছাড় বা ওয়েভার দেওয়া “সম্পূর্ণ প্রশ্নের বাইরে।”
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর পর এখন একসঙ্গে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে — ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি “আমাদের চেয়ে অনেক বেশি তাদের যুদ্ধ।” তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি “অর্থবহ ও যাচাইযোগ্যভাবে” পরিত্যাগের বিনিময়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।
ইরানের সরকার-সমর্থিত তাসনিম ও মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা “কিউবা” নামের একটি সুপারট্যাংকার — যেটি ২০২৪ সাল থেকে চীনে ইরানি তেল পরিবহনের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে — হরমুজ প্রণালি পার হয়ে লারাক দ্বীপের পূর্বে নোঙর করেছে। তাসনিম বলছে, এর আগেও বেশ কয়েকটি ইরানি জাহাজ মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে প্রণালি পার হয়েছে — যা মার্কিন দাবির বিরুদ্ধে ইরানের অন্যতম বড় প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
দিনের সবচেয়ে ইতিবাচক সংবাদটি এসেছে তেহরান থেকে। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর থেকে বন্ধ থাকা তেহরানের ইমাম খোমেইনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার ৫৭ দিন পর প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক উড়ান শুরু হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ইস্তানবুল, মাসকাট ও সৌদি আরবের মদিনার উদ্দেশে ফ্লাইট ছেড়েছে।
রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ইরান এয়ার ৫৬ দিনের বিরতির পর তেহরান থেকে মাশহাদ রুটে প্রথম অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনা করেছে বলে আইআরএনএ নিউজ সার্ভিস জানিয়েছে। ইরান কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, শীঘ্রই বাকু, নাজাফ, বাগদাদ ও দোহা রুটেও ফ্লাইট শুরু হবে এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে পুনরায় রুট পরিচালনায় আকৃষ্ট করতে আলোচনা শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা কয়েক সপ্তাহ প্রায় বন্ধ ছিল, হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েছিলেন এবং বহু দেশ তাদের নাগরিকদের বিশেষ ফ্লাইটে ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খেয়েছিল।
লেবানন: যুদ্ধবিরতি বাড়ল, রকেট-হামলা থামল না
ট্রাম্পের ঘোষণা করা তিন সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বর্ধিত হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। শনিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি এলাকায় হামলা চালিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছেন। শনিবার বিকেলে লেবানন থেকে আরও দুটি রকেট ছোড়া হয় — উত্তর ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি শহরে বিমান হামলার সাইরেন বাজে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, একটি রকেট বাধা দেওয়া হয়েছে, অপরটি খোলা মাঠে পড়েছে।
হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, শনিবার তারা দক্ষিণ লেবাননের আকাশে ইসরায়েলের একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও এই ঘটনা নিশ্চিত করেছে। হিজবুল্লাহ সংসদীয় ব্লক এর নেতা মোহাম্মদ রা’দ বলেছেন, যে যুদ্ধবিরতিতে হিজবুল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত না করে করা হয়েছে এবং যেটিতে ইসরায়েলি প্রত্যাহারের শর্ত নেই, তা “প্রতিরোধের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।”
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, হিজবুল্লাহ ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি “ঐতিহাসিক” শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টা “নস্যাৎ” করার চেষ্টা করছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, ইসরায়েল “যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত” এবং ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছে। এদিকে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়া প্রস্টেট ক্যান্সারের সফল চিকিৎসা নিয়েছেন।
সিএনএন জানিয়েছে, লেবানিজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ২,৪৯৬ জন নিহত হয়েছেন — যার মধ্যে ১৭৭ জন শিশু। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বিন্ট জবেইল শহরের কেন্দ্র সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে।
যুদ্ধ প্রায় দ্বিতীয় মাসের কাছাকাছি এসে শান্তি আলোচনার আরেকটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ইরান সরাসরি বৈঠক নাকচ করেছে, আর ট্রাম্প নিজের দূত পাঠানো বাতিল করে কড়া বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু একটি ইতিবাচক ঘটনা যে, তেহরান বিমানবন্দরে বিমান চলাচলের পুনরায় আরম্ভ হয়েছে – পরিস্থিতির যে একেবারে থমকে নেই, এ ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। সামনের দিনগুলোতে আরাগচির ওমান ও রাশিয়া সফরের সাথে ট্রাম্পের কূটনীতি, এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ফলাফল নির্ধারণ করবে – শান্তির পথ আদৌ খুলবে কিনা। এই যুদ্ধ এখন আর শুধু দুটি দেশের লড়াই নয়। হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল চলাচল করে – সেই পথ অবরুদ্ধ থাকায় এশিয়া থেকে ইউরোপ, উপসাগরীয় দেশ থেকে আফ্রিকা – সবখানে মানুষ জ্বালানির দাম, খাদ্যের দাম আর অনিশ্চয়তার ভার বহন করছে। লেবাননের ধ্বংসস্তূপ, গাজার ক্ষুধার্ত মানুষ, তেহরানের বিমানবন্দরে অপেক্ষায় থাকা যাত্রী – এই যুদ্ধের মানবিক মূল্যটা কোন ক্যালকুলেটরে মাপা যাচ্ছে না।