এম আবদুল্লাহ:
এক.
‘ওয়াল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’। আক্ষরিক অর্থে- ‘বিশ্ব স্বাধীন সংবাদপত্র দিবস’। আর ব্যাপক অর্থে ‘বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবস’ও বলা যেতে পারে। যদিও দিনটি বাংলাদেশে ‘মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ‘প্রেস’-এর বঙ্গানুবাদ ‘গণমাধ্যম’ কী করে হয় সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। এর আগেও একাধিক লেখায় এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে কোন সমাধান পাইনি। কেউ গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল’ তার নামের সীমাবদ্ধতার কারণেই সংবাদপত্র ছাড়া অন্য কোন সংবাদমাধ্যমের বিষয় আমলে নিতে পারে না। সে যাই হোক, ৩ মে দিনটি বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যম ও সাংবদিকতার অবস্থা মূল্যায়নের দিন হিসেবে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। ১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত একটি সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ মে মাসের ৩ তারিখকে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে‘ হিসেবে ঘোষণা করে।
এবারে দিনটিতে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্রমাগত অবনতির দিকটি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দিনটি পালনের ক্ষেত্রে প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সাংবাদিকদের সুরক্ষা, সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’। যদিও জাম্বিয়ার লুসাকায় দিনটি পালন উপলক্ষে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে তার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে “শান্তির ভবিষ্যৎ গঠন”। আগামীকাল ৪ মে দু’দিনব্যাপী এ আন্তার্জাতিক সম্মেলন শুরু হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে পুনঃনিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের জন্য তথ্য ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করার বাস্তবসম্মত উপায় নিয়ে সাংবাদিকতা, প্রযুক্তি (এআইসহ) ও মানবাধিকার কর্মীদের একত্রিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনার করা হচ্ছে লুসাকা সম্মেলনকে। সাংবাদিকতা, প্রযুক্তি, নাগরিক পরিপরিসর এবং মানবাধিকারের মধ্যকার সীমারেখাগুলো একে অপরের সঙ্গে ক্রমশঃ জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে সম্মেলনে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবসে জাতিসংঘ মহাসচিব অন্তনিও গুতেরেস যে বার্তা দিয়েছেন তাতে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের ভয়াবহ দুরবস্থা ফুটে উঠেছে। মহাসচিব তার বার্তায় ‘যুদ্ধের প্রথম বলি হয় সত্য’- এ বাস্তবতা তুলে ধরে বলেছেন, কেবল যুদ্ধেই নয়, যে সকল সাংবাদিক সত্য তুলে ধরতে চান তারা প্রায়শঃ ক্ষমতাবানদের ভয়ে ভীত থাকেন এবং বলি হয়ে থাকেন। সারা বিশ্বে সংবাদমাধ্যমকর্মীরা সেন্সরশিপ, নজরদারি, আইনি হয়রানি–এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন বিশ্বসংস্থার মহাসচিব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সাংবাদিকদের সংখ্যার ব্যাপকতা এবং সাংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের পঁচাশি শতাংশই তদন্তহীন ও শাস্তিহীন থেকে যায় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি অগ্রহণযোগ্য মাত্রার দায়মুক্তি। অর্থনৈতিক চাপ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নানা ধরনের কারসাজিও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে অভূতপূর্ব চাপের মধ্যে ফেলছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি বলেছেন তা হলো, ‘যখন নির্ভরযোগ্য তথ্যের সহজলভ্যতা কমে যায়, তখন অবিশ্বাস শিকড় গাড়তে শুরু করে। যখন গণআলোচনা বিকৃত হয়, তখন সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং যখন সাংবাদিকতাকে দুর্বল করা হয়, তখন সংকট প্রতিরোধ ও সমাধান করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে’। তাঁর ভাষায়- ‘সকল স্বাধীনতা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর নির্ভরশীল। এটি ছাড়া মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন এবং শান্তি সম্ভব নয়’। তিনি বিশ্ববাসীর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, এই বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দিবসে, আসুন আমরা সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা করি এবং এমন একটি বিশ্ব গড়ে তুলি যেখানে সত্য এবং সত্যবাদীরা সুরক্ষিত থাকবে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবস পালনের ওপর জোর দিয়ে থাকে ইউনেসকো। ইউনেসকোর মতে- এ দিনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতানির্ভর সাংবাদিকতাকে উতসাহিত করার দিন। আবার স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পেছনে ছুটতে গিয়ে বিশ্বব্যাপী যে সব অকুতোভয় সাংবাদিক জীবন দিয়েছে তাদের স্মরণ করার দিনও ৩ মে।
প্রতি বছর এ দিনটিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মৌলিক নীতিগুলি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি মুক্ত সাংবাদিকতার উপর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এবং নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এমন সাংবাদিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কথা বলা হয় ইউনিস্কোর ঘোষণায়। এ দিনের মূল কথা হচ্ছে সংবাদমাধ্যম এবং মত প্রকাশের টেকসই স্বাধীনতা। পারষ্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এ স্বাধীনতাকে সুসংহত করার ওপর জোর দেওয়া হয় এ দিনটিতে। বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর গণতন্ত্রের দেশে আমরা দিনটির মূল প্রতিপাদ্যের প্রতি কতটা সুবিচার করতে পারছি সে প্রশ্নটি বরাবরই অমীংসিত থেকে যাচ্ছে।
দুই.
৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এ বছরও ‘বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক’ প্রকাশ করেছে প্যারিসভিত্তিক রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ। এবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের তিন ধাপ অবনতি হয়েছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, গত বছর এই অবস্থান ছিল ১৪৯তম। অবশ্য তার আগের বছর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৫তম। এবারের তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ১৫৭ তম স্থানে ও পাকিস্তান ১৫৩ তম স্থানে রয়েছে। দু’টি দেশই বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে- এটি আত্মতুষ্টির একটি অবলম্বন হতে পারে।
আরএসএফএর তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকের ইতিহাসে প্রথমবারের মত অর্ধেকেরও বেশি দেশ ‘কঠিন’ অথবা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে যুক্ত হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের গড় স্কোর এর আগে কখনো এত নিচে নামেনি।
আরএসএফ তাদের বিশ্লেষণে বলছে, ২০০১ সাল থেকে ক্রমেই কড়াকড়ি হয়ে ওঠা আইনি ব্যবস্থার বিস্তার- বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে যুক্ত আইনগুলো ধীরে ধীরে তথ্য জানার অধিকারকে ক্ষয় করে যাচ্ছে। এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এটা ঘটছে। এবারের সূচকের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে- আমেরিকা মহাদেশে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র সাত ধাপ নেমে গেছে ও লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ সহিংসতা ও দমনপীড়নের আরও গভীর চক্রে ঢুকে পড়েছে।
বাংলাদেশের তিন ধাপ অবনতির কারণ বিশ্লেষণে আরএসএফ’র প্রতিবেদনে কিছু নতুন বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রধান দুই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতার কোনো ধরনের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নেই। তারা সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাসসের অবস্থাও একই। এখানে আরএসএফ’র কিছুটা তথ্য ঘাটতি থেকে থাকতে পারে। কারণ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি আগের বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা বাড়তি স্বাধীনতা ভোগ করেছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর। বিটিভি নিউজ নামে নতুন চ্যানেল চালু করে কিছুটা হলেও পেশাদারি মনোভাব নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে দেখা যাচ্ছে। বিটিভির টকশোতে সরকারের সমালোচনা করার নজীরও স্থাপিত হয়েছে প্রথম বারের মতো। সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী বা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা ছাড়াও ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর খবর অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অধিক প্রচার করে বিটিভি ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা। সূচক নির্ধারণে এর প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে হয় না। বিগত সরকার বিটিভির একটি সংবাদ বুলেটিন বেসরকারি টেলিভিশনগুলোতে প্রচার বাধ্যতামূলক করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছে বেসরকারি চ্যানেলগুলোকে। এটাও সূচকে প্রতিফলিত হওয়া উচিৎ ছিল।
আরএসএফ বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনে সংবাদমাধ্যম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তাদের রিপোর্টে তুলে ধরেছে। বলেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সেন্সরশিপ, সাইবার হয়রানি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার চাপ, বিচারিক হয়রানি, দমন–পীড়নমূলক আইন ও পুলিশের সহিংসতার মুখে সাংবাদিকতা চরম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আরএসএফের প্রতিবেদনে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকার বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আদলে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) প্রবর্তন করেছিল। এই আইন সাংবাদিকদের জন্য অত্যন্ত দমনমূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো ধরনের পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তার, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ এবং সোর্সের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সুযোগ দেয়। এমন পরিবেশে সম্পাদকেরা প্রায়ই ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বা নিজেদের লেখায় নিজেরা কাঁচি চালাতে বাধ্য হন।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় পরাধীনতার আসল রোগও ধরা পড়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় হিসেবে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের অধিকাংশ বড় সংবাদমাধ্যম এখন গুটিকয় বড় ব্যবসায়ীর মালিকানায়। তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে প্রভাব খাটানোর হাতিয়ার ও মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাকেই তাঁরা বেশি গুরুত্ব দেন।
আরএসএফের প্রতিবেদনটিতে চোখ বুলিয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে সংগঠনটির সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোকান্দের বিশ্লেষণ। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত করার কোন সুযোগ নেই। তিনি বলেছেন, ‘তথ্যের অধিকারের ওপর হামলা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্রপূর্ণ ও সূক্ষ্ম উপায়ে হচ্ছে। যারা এসব ঘটাচ্ছে, তারা এখন আর কোনো রাখঢাক করছে না। বোকান্দে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা, অযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি, লুটেরা অর্থনৈতিক গোষ্ঠী এবং অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন মাধ্যম।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় বসে তখন বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২১তম। কিন্তু প্রায় ১৬ বছরের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার বিদায়ের বছর ২০২৪ সালে তা ৪৪ ধাপ অবনতি ঘটে ১৬৫তম স্থানে নেমে যায়। শেখ হাসিনার গুম, খুন, নিপীড়ন, নির্যাতনের শাসনে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের জন্যেও ছিল এক কালো অধ্যায়। ৫৯ জন সাংবাদিক খুনের শিকার হয়েছেন তাঁর দেড় দশকের শাসনে। সাগর-রুনি দম্পতিসহ খুন হওয়া সাংবাদিকদের অধিকাংশের পরিবার বিচার পায়নি। খুনিরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভিন্নমতের সংবাদপত্র ও টেলিভিশন গায়ের জোরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন সাংবাদিক হামলা, মামলা, নির্যাতন ও নানা কিসিমের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনে সাংবাদিকেরা অবারিত স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। ২০২৫ সালের মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশ এক সঙ্গে ১৬ ধাপ এপিয়ে ১৪৯তম স্থানে উঠে এসেছিল। সরকারের সমালোচনার জন্যে অন্তর্বর্তী শাসনে কোন সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার হননি। তবে বিভিন্ন সামাজিক অপশক্তির দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা থেমে থাকেনি। ফ্যাসিবাদী শাসনে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে অনেক সাংবাদিক হত্যা ও হত্যায় উস্কানির মামলায় আসামী হয়েছেন। এসব মামলায় আনীত অভিযোগের যথার্থতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন আছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দায়েরকৃত মামলাগুলো হয়েছে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে। সরকারের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না।
শেখ হাসিনার প্রতি অতিশয় অনুরক্ত ও মাত্রাতিরিক্ত তেলবাজিতে নিন্দিত ৪জন সাংবাদিক দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সীমান্তের কাছে ও এয়ারপোর্টে আটক হয়ে এখনও জেলে আছেন। সাংবাদিকতার বাইরে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজম করতে গিয়ে জুলাই যোদ্ধাদের দাবির মুখে তিনজন সিনিয়র সাংবাদিক ড. ইউনূস সরকারের সময়ে গ্রেফতার হয়েছেন। কয়েক মাস জেল খাটার পর তারা জামিনে মুক্তিও পেয়েছেন। বর্তমানে জেলে থাকা এবং মুক্তি পাওয়া সাংবাদিকদের অনেকের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পেয়ে দুদক মামলা করেছে। অন্যদিকে সরকার হঠানোর ষড়যন্ত্রের এক বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ গ্রেফতার হয়ে এখনও জেলে আছেন। যদিও তাঁর বিষয়টি সেভাবে আলোচনায় আসছে না। ড. ইউনূসের আমলে সংগঠিত এ ঘটনাগুলো সম্ভবতঃ সদ্য প্রকাশিত সূচকে তিন ধাপ অবনমনে ভূমিকা রেখেছে। এবারে অবনতির পরও আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে ১৩ ধাপ এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
এটাও ঠিক যে সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সাংবাদিক নিপীড়ন বন্ধ হয় না। বর্তমান সরকারের সময়েও সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন, আক্রান্তও হচ্ছেন। গত মাসেই ঢাকা বিম্ববিদ্যালয়ে দু’দিনে ১৬ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। অভিযোগ সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত বিরতিতে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৭ সালের ‘বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবস’ -এর আগে আরএসএফ যে সূচক প্রকাশ করবে তাতে বড় ধরনের অবনতির আশঙ্কা প্রবল হবে।
বিএনপি সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সুহৃদ এবং অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী দল হিসেবে পরিচিত। শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংবাদপত্র তথা সংবাদমাধ্যমের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু এবার ক্ষমতায় আসার পর দলটির কোন কোন নেতাকর্মী এমনকি মন্ত্রীসভার কতিপয় সদস্যের অসহিষ্ণু মনোভাব এরই মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনায় তারা সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে টার্গেট করছেন। সংবাদপত্রে সরকারি ক্রোড়পত্রকে হাতিয়ার বানানোর পুরনো প্রবণতা বর্তমান সরকারের অনেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, যা অনভিপ্রেত ও খুবই উদ্বেগজনক। ফ্যাসিবাদী হাসিনার জুতোতে পা ঢুকালে বিএনপি’র উদার গণতান্ত্রিক ও ভিন্নমত-সহিষ্ণু ঐতিহ্য প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সরকারকে যেমন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিককের সুরক্ষার অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে, তেমনি সাংবাদিকদেরও পেশাদারি মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতায় যুক্ত অনেক তরুণ সংবাদকর্মী খুব বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন। সহিংস পরিবেশে নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি গৌন করে যারা কাজ করেন তারা বিভিন্ন পক্ষ থেকেই আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
‘বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম দিবসে’ আমাদের করণীয় নির্ধারণের সময় এসেছে। স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় কিছু কালাকানুন থেকে এরই মধ্যে মুক্তি মিলেছে। ডিজিটাল জাল থেকে মুক্তির পথ সন্ধানের পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং ভীতির পরিবেশ সৃষ্টিকারি আরও যেসব কালাকানুন রয়েছে তার অক্টোপাস থেকে মুক্তির পথ বের করতেই হবে। তা করতে হবে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মাধ্যমে।
বিশেষতঃ সাংবাদিকদের ‘অপরাধী’ বানানোর জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রবণতা বন্ধে গণতান্ত্রিক সরকার ও নাগরিকদের আরও স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভূমিকা কাম্য। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ ও সাবেক সভাপতি, বিএফইউজে।