মুক্তবাণী রিপোর্ট : চতুর্থ মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে গত তিন মাসে বেশ কিছু উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিএনপি। তবে এ অগ্রযাত্রার সমান্তরালে ‘জুলাই সনদ’ ও ‘সংস্কার ইস্যু’কে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা বিরোধী দলগুলোর নেতিবাচক প্রচারণা ঘিরে ভাবিয়ে তুলেছে বিএনপিকে। এমন পরিস্থিতিতে সংগঠনকে চাঙ্গা রাখা এবং বিরোধী প্রচারণার জবাব দিতে দেশজুড়ে মাসব্যাপী জনসংযোগ ও বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে ক্ষমতাসীন দলটি। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দলের বার্তা সম্বলিত বিশেষ দলীয় চিঠি ও লিফলেট পাঠানো হয়েছে সারাদেশে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘গণভোট’ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে এক ধরনের রাজনৈতিক মতবিরোধের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই বিরোধ যেন কোনোভাবেই রাজপথে বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের রূপ না নেয়, সেদিকে কড়া নজর রাখছে বিএনপি। বিশেষ করে বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে ছড়ানো ‘বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কার চায় না’- এমন প্রচারণাকে সম্পূর্ণ অসত্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
এই দুই সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরতেই মূলত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। যদিও বিএনপি প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে শুরু করে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর বলে বারবার বলছেন। কিন্তু জামায়াত ও এনসিপির নেতারা প্রতিনিয়ত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে বিএনপিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বলে দলটির নেতাদের অভিযোগ।
সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় নেতা-কর্মীদের এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি দলীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) নিজ নিজ এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে গভীর সমন্বয় সাধন করে কর্মসূচি নির্ধারণের নির্দেশ দেন। তারেক রহমান সাফ জানিয়ে দেন, বিএনপি শুরু থেকেই জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জানা গেছে, নতুন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত একটি বিশেষ চিঠি দেশের প্রতিটি সাংগঠনিক জেলা ও মহানগরের দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে দলীয় গঠনতন্ত্রে স্বীকৃত সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় জোরদার করার এবং সাংগঠনিক ভিত্তি আরো মজবুত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং কৃষক দলসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো দেশব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ শুরু করেছে।
যেভাবে বাস্তবায়ন হবে কর্মসূচি:
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, এক মাস সারাদেশে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। এর মধ্যে উঠান বৈঠক, পথসভা, লিফলেট বিতরণ, মতবিনিময় সভা, মিছিল এবং সরাসরি গণসংযোগের মতো কর্মসূচি থাকতে পারে। জেলা, মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়নসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এসব কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব জেলা ও মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হবে না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
সূত্র আরও জানায়, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিরোধীদের প্রচারণার জবাব দিতে সারাদেশে লিফলেট পাঠানো হয়েছে। লিফলেটে বলা হয়েছে, গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে ‘খ’ নম্বর প্রশ্নটি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী এবং তা ‘প্রতারণামূলক’। একই সঙ্গে লিফলেটে উল্লেখ রয়েছে, বিএনপি জুলাই সনদ অনুযায়ী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত সনদ বিএনপি ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মানতে বদ্ধপরিকর।
এছাড়া লিফলেটে সংসদে নারী প্রতিনিধি বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচনসহ যেসব বিষয় ইতোমধ্যে বিরোধী দল লঙ্ঘন করেছে, তাও তুলে ধরেছে বিএনপি। পাশাপাশি জুলাই সনদের ১৮ ও ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী যে সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে মর্মে বলা আছে, তাও তুলে ধরা হয়েছে।
লিফলেটে আরও উল্লেখ রয়েছে, গণভোটের ‘ঘ’ প্রশ্নে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে; তা বিএনপি অক্ষরে অক্ষরে মানতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
দল চাঙ্গা করতে ভিন্নধর্মী কৌশল :
এদিকে সরকার গঠনের পর দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও হতাশা দেখা গেছে। বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না—প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ তুলেছেন নেতা-কর্মীরা। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে দলের নেতা-কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে না, এমনটা বলা হচ্ছে।
তবে বিএনপির শীর্ষ নেতারা দল এবং সরকারকে একাকার করে ফেলতে নারাজ। এই কারণে এবার কঠোরভাবে দল ও সরকারকে আলাদা রেখেই সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলেন, কোরবানি ঈদের পরপরই দলের মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা, মহানগর এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা তদবিরের সুযোগ থাকবে না। শুধুমাত্র বিগত দিনের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও যোগ্য নেতা-কর্মীদেরই নেতৃত্বে আনা হবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দলীয় সংগঠন শক্তিশালী ও সুসংহত হবে, অন্যদিকে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে নতুন করে উদ্দীপনা ও চাঙ্গাভাব ফিরে আসবে বলে আশা করছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
বিরোধী দলগুলোর অপপ্রচার ও রাজনৈতিক কৌশল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গণতন্ত্রে সরকার কাজ করবে এবং বিরোধী দল তার সমালোচনা করবে-এটিই স্বাভাবিক। তবে সেই সমালোচনা ও কর্মসূচি হতে হবে গঠনমূলক, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র আরও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বিরোধী দল যদি কোনো সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে সরকারকে বিপদে ফেলার উদ্দেশ্যে অনবরত মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালায়, তবে তাকে সমালোচনা বলা যায় না, তা মূলত ষড়যন্ত্র। আর আমরা সেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র যাতে বাস্তবায়ন না হয়, সেই বার্তা দিতে সরাসরি জনগণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’