মো. হাফিজ উদ্দিন :
ঈদুল আজহার আর মাত্র দশেক দিন বাকি। পবিত্র এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কোরবানির পশু প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পশুর হাট বসছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচা শুরু হয়েছে এবং মানুষজন তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পশু ক্রয়ের পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে কোরবানির পর উৎপন্ন কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে চলছে নানামুখী তৎপরতা ও জোরালো প্রস্তুতি। তবে কোরবানির চামড়ার বাজার নিয়ে শঙ্কার মেঘ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। গত বছরের বকেয়া অর্থ ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পুরোপুরি আদায় না হওয়ায় সরবরাহকারী, আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চরম অর্থসংকটে রয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলতি মৌসুমের অসহনীয় গরম, সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা, পরিবহন ব্যবস্থার জটিলতা, লবণের মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যান্য নানা প্রতিবন্ধকতা। ফলে এবারও বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা পুরো খাতকে নিয়ে যেতে পারে গভীর সংকটে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এটি শুধু রপ্তানি আয়ের একটি বড় উৎস নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করে। কোরবানির ঈদের সময় উৎপন্ন চামড়া পুরো বছরের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটায়। প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশে কয়েক লাখ পশু কোরবানি হয়। এর মধ্যে গরুর চামড়াই সবচেয়ে বড় অর্থকরী কাঁচামাল হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কাঁচা চামড়ার বাজারে নানা ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সিন্ডিকেটের প্রভাব, লবণ সংকট, পরিবহন জটিলতা, ট্যানারি শিল্পের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা এবং অপর্যাপ্ত মনিটরিং — এসব কারণে চামড়ার প্রকৃত উপকারভোগী এতিমখানা, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, লিল্লাহ বোর্ডিং এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। ফলে তাদের আর্থিক অবস্থা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক মাদ্রাসা ও এতিমখানা সারা বছরের ব্যয় মেটাতে এই চামড়া বিক্রির টাকার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। দাম কম পেলে বা চামড়া নষ্ট হলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম, খাবার সরবরাহ এবং অন্যান্য সেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি কোরবানির চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এবার ঢাকার ভেতরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে দুই টাকা বেশি। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়ার দাম নির্ধারিত হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। অন্যদিকে সারাদেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দাম কিছুটা বাড়ানো হলেও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাটছে না। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও মাঠপর্যায়ে ঘোষিত এই দাম পুরোপুরি কার্যকর হবে না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, মনিটরিংয়ের অভাব, রাতের বেলায় সংগ্রহের সময় দেরি এবং স্থানীয় বাজারের জটিলতা এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রতি বছর সরকার কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে সেই দাম যথাযথভাবে কার্যকর হয় না বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নজরদারির অভাব, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যধিক দৌরাত্ম্যের কারণে ঘোষিত মূল্য অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এবার যদি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আগেভাগে সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ, মোবাইল মনিটরিং টিম গঠন এবং সরাসরি ট্যানারির সঙ্গে সংগ্রাহকদের সংযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, এবারও যদি সরকার কার্যকর তদারকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা না রাখে, তাহলে ঈদের পর চামড়ার বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং হাজার হাজার চামড়া অব্যবস্থাপনার কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। অন্যদিকে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে দেশের চামড়া শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এবং রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বিশ্ববাজারে বড় সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সম্পদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি ও উদ্যোগ:
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। চামড়া যেন একটিও নষ্ট না হয় এবং দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পে যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়, সে লক্ষ্যে সারাদেশে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহসহ নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদের আগে বাকি জুমায় দেশের সকল মসজিদে খতিব ও ইমামদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা খুতবা ও বক্তব্যে চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া ছাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে মাদ্রাসা, এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনারদের নেতৃত্বে বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসকদের প্রশিক্ষণ-পরবর্তী মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাঁচা চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ১৭ কোটির অধিক টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা এবং জেলা পর্যায়ে ৭৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
চামড়া সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হবে। টেলিভিশন, রেডিও, জাতীয় পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে। ঈদের তিন দিন আগে থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সচেতনতামূলক তথ্যচিত্র প্রচার করা হবে।
সরকার আরও নির্দেশনা দিয়েছে যে, কোরবানির ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে সঠিকভাবে চামড়ায় লবণ প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি গরুর চামড়ায় ৮ থেকে ১০ কেজি এবং প্রতি ছাগলের চামড়ায় ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ ব্যবহার করতে হবে। বায়ু চলাচলসমৃদ্ধ স্থানে চামড়া সংরক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত চামড়া রেখে সংরক্ষণে উৎসাহ প্রদান, পশুর হাটে পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, অপপ্রচার ও চামড়া বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ, সড়ক ও মহাসড়কের পাশে পশুর হাট না বসানো এবং কোরবানির বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চামড়া নষ্টের হার অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ট্যানারি মালিকদের অর্থসংকট ও শিল্পের চ্যালেঞ্জ:
সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে এখনও অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, ব্যাংকঋণ সংকট এবং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতার কারণে বেশ কয়েকটি ট্যানারি আর্থিক চাপে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে ঈদের সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া কিনতে পারছেন না। এবারও বাজারে চাহিদা কমে গেলে দাম আরও পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আড়তদাররা জানিয়েছেন, চামড়া সংরক্ষণের খরচ অনেক বেড়েছে, কিন্তু বিক্রির নিশ্চয়তা নেই।
সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এর সংস্কার, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, কেমিক্যাল মজুত এবং যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ চলছে। তবে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় শিল্পে ধাক্কা লেগেছে।
মাদ্রাসা ও এতিমখানার দুশ্চিন্তা:
দেশের বহু কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানার পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ আসে ঈদুল আজহার সময় প্রাপ্ত চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে। সারা বছরের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে এই আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাজারদর কমে গেলে বা চামড়া নষ্ট হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজধানীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষক জানিয়েছেন, আগে একটি গরুর চামড়া থেকে ভালো টাকা পাওয়া যেত। এখন অনেক সময় পরিবহন খরচও উঠে না। ফলে সংগ্রহে আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, “কোরবানির চামড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে দেশের চামড়া শিল্প, রপ্তানি আয় এবং এতিমখানা, মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সামান্য অসচেতনতার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এ পরিস্থিতি রোধে সরকার এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। কোরবানির একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয় — এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেছেন। আমরা এটিকে একটি জাতীয় দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।”
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান, আফতাব খান, মো. সাখাওয়াত উল্লাহ, আশরাফ উদ্দিন আহমদ খান এবং অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খানসহ অনেকে তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা লবণের দাম বৃদ্ধি, সময়মতো সংরক্ষণ, মনিটরিং, ঋণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াকরণের ওপর জোর দিয়েছেন।
এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, যা চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি। সারাদেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। ঢাকায় ২৭টি হাটে ২০টি ভেটেরিনারি টিম কাজ করবে। এবারও অনলাইনে পশু কেনাবেচা চলবে।
ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, কোরবানির চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং শিল্পের উন্নয়ন এখন একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের ঘোষিত সব উদ্যোগ যদি মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এবারের ফলাফল ইতিবাচক হবে এবং দেশের চামড়া খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয় —এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।