আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রাথমিক চুক্তির বিস্তারিত তথ্য মঙ্গলবার থেকে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। এদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেল বিক্রি করার সুযোগ পাবে।
চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এর মাধ্যমে গত এপ্রিল মাসে ঘোষিত নাজুক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে, যেন দুই দেশ একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে।
প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে। বিনিময়ে ইরানও কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভিন্ন সময় ইরানে হামলার পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি দিলেও, তার ঘোষিত সামরিক লক্ষ্যগুলোর খুব কমই অর্জিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এত বড় সংঘাতের পরও ইরানের সরকার টিকে আছে; দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া যায়নি এবং হিজবুল্লাহর মতো ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
এই চুক্তির কারণে ট্রাম্প নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন, বিশেষ করে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের নেতারাও অভ্যন্তরীণ চাপে আছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির সরকার যদি এই চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের নতুন করে গণবিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হবে।
ইসরায়েল সরাসরি এই চুক্তির আলোচনায় অংশ নেয়নি। দেশটি এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি এবং সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি— দুটো থেকেই নিজেকে দূরে রেখেছে। ফলে নতুন এই যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের সিংহভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, এই চুক্তির আওতায় ইসরায়েল ও লেবাননও রয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে সোমবার (১৫ জুন) সাফ জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং তারা দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না।
এর জবাবে হিজবুল্লাহর এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েলি দখলদারি চলতে থাকলে ইরান স্থায়ী শান্তিতে সম্মত হবে না। ইরানের সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ও দক্ষিণ লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে ইসরায়েলকে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলেছেন, ইসরায়েল যেভাবে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তাতে তিনি খুশি নন। ইরানের সঙ্গে পরবর্তী ধাপের আলোচনা সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, “ইরান চুক্তিটি করতে চায়। তাদের আবার ব্যবসা-বাণিজ্যে ফিরতে হবে। এখন সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে, তাই আলোচনা খুব দ্রুত এগোবে।”
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় মজুত গড়ে তোলে। ট্রাম্প এখন সেই ৪৪০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ বা ধ্বংস করতে চান। ফ্রান্সের জি-৭ বৈঠকে ট্রাম্প জানান, তিনি এই নতুন চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠাবেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানে যুদ্ধ শুরু করার কারণে ট্রাম্প মার্কিন জনগণের মধ্যেও সমালোচনার মুখে আছেন।
এদিকে চুক্তির খবর প্রকাশের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। সোমবার (১৫ জুন) প্রায় ৫ শতাংশ পতনের পর গতকাল তেলের দাম আরও ২ শতাংশের বেশি কমে তিন মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাস উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।