বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৫ মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

‘নাজুক ভূমির’ ওপর ঢাকা, ভূমিকম্প ঝুঁকিতে ৫৫-৬০ শতাংশ এলাকা!

মুক্তবাণী রিপোর্ট : নগরায়ণের চাপে ঢাকার অনেক জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে। নিচু এলাকায় গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প এবং নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন।
তবে এসব ভবনের অনেকগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

ডেইলি স্টার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাজউক ও বুয়েটের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকা ঝুঁকি মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পের সময় এসব এলাকার মাটি শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এতে ভবন বসে যাওয়া, হেলে পড়া বা ফাটল ধরার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘আলগা ও ভরাট করা মাটির কারণে এসব এলাকায় ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি বেশি অনুভূত হতে পারে। তার মতে, রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার অর্ধেকেরও বেশি বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।’

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ঢাকার মাটি মূলত নরম কাদামাটি ও পলিমাটি দিয়ে গঠিত, যা ঘনবসতিপূর্ণ নগরায়ণের জন্য খুব উপযোগী নয়।
ফলে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ভবন ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। গবেষকরা লিকুইফ্যাকশন পটেনশিয়াল ইনডেক্স (এলপিআই) ব্যবহার করে ঢাকাকে চারটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে লাল অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, ম্যাজেন্টা মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, নীল তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং সবুজ সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ।

অধ্যাপক আনসারি বলেন, ‘৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে লাল অঞ্চলের মাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নদী, খাল ও পুকুরসংলগ্ন এলাকায়, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বেশি, সেখানে ঝুঁকি আরো বেশি।’

তিনি ১৯৮৫ সালের মেক্সিকো সিটি ভূমিকম্পের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল অনেক দূরে হলেও নরম মাটি কম্পনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। তার মতে, বালু দিয়ে ভরাট করা মাটি তরলীকরণ ও অতিরিক্ত কম্পন, দুই ধরনের ঝুঁকিই বাড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদভাবে ভবন নির্মাণ সম্ভব, তবে তার জন্য সঠিক পাইলিং ও মাটি শক্তিশালী করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে মাটির ওপরের ৫ থেকে ৬ মিটার অংশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

অধ্যাপক আনসারির ভাষ্য, ঢাকার অধিকাংশ ভরাট এলাকায় শুধু পাইলিং করা হয়, কিন্তু আশপাশের মাটি শক্তিশালী করা হয় না। ফলে ভূমিকম্পের সময় ভবন হেলে পড়া বা কাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ঢাকার মাত্র ৩৫ শতাংশ এলাকা শক্ত লাল মাটির ওপর অবস্থিত। বাকি অংশ জলাভূমি, বন্যাপ্রবণ এলাকা, পুরোনো খাল ও নিচু জমি নিয়ে গঠিত।

তার মতে, পুরান ঢাকা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, খিলগাঁও, মতিঝিল, ফার্মগেট ও মিরপুর তুলনামূলকভাবে শক্ত মাটির ওপর গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে নদীসংলগ্ন ও ভরাট করা এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির ধরন অনুযায়ী ভবনের নকশা করা এবং বাংলাদেশ জাতীয় নির্মাণবিধি (বিএনবিসি) কঠোরভাবে অনুসরণ করা হলে ভূমিকম্পজনিত ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তবে নরম মাটির ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি হলেও তা এখনো নগর পরিকল্পনায় পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। রাজউক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ড্যাপ হালনাগাদের সময় বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

অন্যদিকে রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভুইয়া বলেন, তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিএনবিসি অনুসরণ করে নির্মাণকাজ পরিচালনা করে। তবে ৭ মাত্রা বা তার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে তার প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা আগাম নির্ভুলভাবে বলা কঠিন।

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল (লাল):

রাজউক ও বুয়েটের ঝুঁকি মানচিত্র অনুযায়ী হাজরতপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, তেঘরিয়া, কোন্ডা, এনায়েতনগর, কাশীপুর, কালাগাছিয়া, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, বন্দর, মোগরাপাড়া, নারায়ণগঞ্জ সদর, বক্তাবলী, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডির কিছু অংশ, নিউমার্কেট, লালবাগ, মদনপুর, দুমনি, বাড্ডা, পাথালিয়া, আশুলিয়া, কাটাবল্লী এবং দারুস সালামের কিছু এলাকা লাল অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকায় ভূমিকম্পের সময় মাটি দুর্বল হয়ে পড়া এবং ভবনের ক্ষতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল (ম্যাজেন্টা):

কোনাবাড়ী, ইয়ারপুর, হরিরামপুরের কিছু অংশ, বিরালিয়া, বিভিন্ন পৌরসভা এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট, পল্লবী, গুলশান, রূপগঞ্জ, ভুলতা, খিলগাঁও, কাফরুল ও দক্ষিণখানের কিছু অংশ, আদাবর, তেজগাঁও, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, কদম রাসুল পৌরসভা, মুসাপুর, ফতুল্লা ও হাজারীবাগের কিছু অংশ, সাদিপুর, কাঞ্চপুর এবং পল্টন ম্যাজেন্টা অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। এসব এলাকাও ভূমিকম্পের সময় উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।