শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৮ মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর সন্তুষ্টি: প্রিয় বান্দাদের মহান গুণ

ধর্ম ডেস্ক : মানুষের জীবন কখনো সুখের, কখনো দুঃখের। কখনো প্রাচুর্য, কখনো অভাব। কখনো সুস্থতা, আবার কখনো অসুস্থতা। এসব পরিবর্তনের মধ্যেই একজন মুমিনের ঈমানের প্রকৃত পরীক্ষা হয়। কারণ একজন সত্যিকার মুমিন শুধু সুখের সময়ই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন না; দুঃখ-কষ্টের সময়ও আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখেন।

ইসলামে এই গুণকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে দেখা হয়েছে। আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা (রিদা বিল-কদা) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

দুনিয়ার জীবন মূলত পরীক্ষার:


আল্লাহ তাআলা মানুষকে কখনো সম্পদ দিয়ে, কখনো অভাব দিয়ে, কখনো সুস্থতা দিয়ে, আবার কখনো রোগ, প্রিয়জন হারানো কিংবা বিভিন্ন বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনেই রয়েছে অসীম প্রজ্ঞা ও কল্যাণ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ সেটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হতে পারে তোমরা এমন কিছু পছন্দ করছ, অথচ সেটিই তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা: ২১৬)

এই আয়াত একজন মুমিনকে শিক্ষা দেয়- মানুষের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান পরিপূর্ণ। তাই জীবনের প্রতিটি ঘটনাকে তাৎক্ষণিকভাবে বিচার না করে আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর আস্থা রাখা উচিত।

মুমিনের প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর:


রাসুলুল্লাহ (স.) মুমিনের জীবনকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি কতই না চমৎকার! তার প্রতিটি কাজই তার জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখ পায় এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, তবে তা তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি সে বিপদে পড়ে এবং ধৈর্য ধারণ করে, তবে সেটিও তার জন্য কল্যাণকর। আর এই সৌভাগ্য মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়।’ (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিনের জীবনে কোনো অবস্থাই সম্পূর্ণ ক্ষতির নয়। সুখে তিনি সওয়াব অর্জন করেন শুকরিয়ার মাধ্যমে, আর দুঃখে সওয়াব অর্জন করেন ধৈর্যের মাধ্যমে।

আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের পরীক্ষা করেন:


অনেকেই মনে করেন, বিপদ মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি। অথচ হাদিসে ভিন্ন শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষা করেন। যে এতে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি; আর যে অসন্তুষ্ট হয়, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ (জামে তিরমিজি)

অর্থাৎ প্রতিটি বিপদ শাস্তি নয়; অনেক সময় তা আল্লাহর ভালোবাসা, গুনাহ মোচন এবং মর্যাদা বৃদ্ধিরও মাধ্যম হতে পারে। অন্য এক হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর কোনো বান্দার মঙ্গল চান, তখন তার গুনাহের শাস্তি দুনিয়াতেই দ্রুত দিয়ে দেন, যাতে আখিরাতে তাকে আর ভুগতে না হয়। পক্ষান্তরে কারও অকল্যাণ চাইলে তার শাস্তি স্থগিত রাখা হয়, যা কেয়ামতের দিন পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হবে। (জামে তিরমিজি)

কোরআনের সুসংবাদ:


আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারাই তারা, যাদের ওপর তাদের রবের পক্ষ থেকে রয়েছে অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত; আর তারাই সঠিক পথপ্রাপ্ত।’ (সুরা বাকারা: ১৫৭)

এ আয়াতের পূর্ববর্তী অংশে আল্লাহ এমন বান্দাদের কথা বলেছেন, যারা বিপদের সময় বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’ এই বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি, বিনয় ও পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা।

ধৈর্য মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি:


ধৈর্য ধারণ করা সহজ নয়। কিন্তু আল্লাহ ধৈর্যশীলদের কখনো নিরাশ করেন না।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীলতা দান করেন। আর ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নেয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (সহিহ বুখারি)

অভিযোগ নয়, আল্লাহর কাছেই মনের কথা:


অনেকেই মনে করেন, কষ্ট পেলে কান্নাকাটি করা বা নিজের দুঃখ প্রকাশ করা আল্লাহর ওপর অসন্তুষ্টির লক্ষণ। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।

হজরত ইয়াকুব (আ.) দীর্ঘদিন প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে গভীর কষ্টে ছিলেন। তবু তিনি মানুষের কাছে ভাগ্যকে দোষারোপ করেননি। বরং আল্লাহর কাছেই নিজের কষ্ট প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।’ (সুরা ইউসুফ: ৮৬)

এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে নিজের কষ্ট, দুঃখ ও অশ্রু নিবেদন করা ইবাদতেরই অংশ। কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা, ভাগ্যকে দোষ দেওয়া বা হতাশ হয়ে পড়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়।

এই বিশ্বাস কেন অন্তরে প্রশান্তি আনে?:


আল্লাহর ফয়সালার ওপর ঈমান ও সন্তুষ্টি মানুষের অন্তরে গভীর প্রশান্তি সৃষ্টি করে। তখন সে অতীতের জন্য অহেতুক অনুশোচনায় ভোগে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায়ও ভেঙে পড়ে না। সে বিশ্বাস করে- আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তাতেই শেষ পর্যন্ত কল্যাণ রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেবে না বা বৈধ উপায়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করবে না। বরং একজন মুমিন যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন, দোয়া করবেন এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করবেন।

নবীদের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়:


আল্লাহর নবী ও প্রিয় বান্দাদের জীবন ছিল পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে, সন্তান কোরবানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘদিন কঠিন অসুস্থতায় ভুগেছেন। রাসুলুল্লাহ (স.)-ও জীবনে একের পর এক দুঃখ-কষ্ট, স্বজন হারানোর বেদনা এবং নানা নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা কেউ আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট হননি। বরং ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির মাধ্যমে মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

একজন মুসলিমের করণীয় :


সুখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং দুঃখে ধৈর্য ধারণ করা।
আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালার পেছনে কল্যাণ রয়েছে—এই বিশ্বাস হৃদয়ে দৃঢ় করা।
বিপদের সময় ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
অভিযোগ, হতাশা ও আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টি থেকে বিরত থাকা।
বেশি বেশি দোয়া, ইস্তেগফার, কোরআন তেলাওয়াত ও নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা।
সুখের সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু দুঃখের সময়ও তাঁর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। এ গুণ অর্জন করতে পারলে বিপদও বান্দাকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং আখিরাতে মহান প্রতিদানের পথ খুলে দেয়। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা এবং বিশ্বাস করা-আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করেন, তাতেই প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে।