মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

আমদানির জ্বালানিতে বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একসময় দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালির প্রধান জ্বালানি। কিন্তু উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ কমে যাওয়া, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে দীর্ঘসূত্রতা এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশকে এখন আমদানিকৃত এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বন্ধ হয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি সৃষ্টি হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থায় ঝুঁকি কতটা গভীর।

এই ঘটনার প্রভাব শুধু গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহে চাপ বেড়েছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে সংকট দেখা দিয়েছে এবং আবাসিক গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। একটিমাত্র অবকাঠামোর সাময়িক অচলাবস্থায় যখন পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে, তখন বোঝা যায় জ্বালানি নিরাপত্তার বর্তমান কাঠামো কতটা ভঙ্গুর।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাত বাড়লেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যেহেতু বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির বড় অংশ ওই অঞ্চলনির্ভর, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং শিল্প অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

সরকার কৌশলগত জ্বালানি মজুদ বৃদ্ধি, নতুন এলএনজি কার্গো আমদানি, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং নতুন টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এগুলো একক সমাধান হতে পারে না। কারণ আমদানিনির্ভরতা যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কাও তত বেশি অনুভূত হবে।

মূল সমস্যা রয়েছে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের যথাযথ উন্নয়নে দীর্ঘদিনের ঘাটতিতে। বঙ্গোপসাগর ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান, বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ আরও আগে ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল। এখন সেই বিলম্বের মূল্য দেশকে আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মাধ্যমে দিতে হচ্ছে।

একই সঙ্গে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণও জরুরি। প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। শিল্প খাতে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অপচয় কমাতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি এলএনজি গ্রহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেও পুরো ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি না হয়।

জ্বালানি খাতে নীতিনির্ধারণেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। রাজনৈতিক পরিবর্তন বা বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব যেন জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিপন্ন না করে, সে জন্য ঝুঁকি মূল্যায়ন, কৌশলগত মজুদ, বহুমুখী আমদানি উৎস এবং দেশীয় সম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত রোডম্যাপ এখন সময়ের দাবি।

সাম্প্রতিক এলএনজি সংকট একটি সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করেছে, শুধু আমদানি বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশের প্রয়োজন এমন একটি টেকসই জ্বালানি কৌশল, যেখানে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, বহুমুখী জ্বালানি উৎস, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সমান গুরুত্ব পাবে। জ্বালানি নিরাপত্তাকে যদি জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এখনই দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প নেই।