মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

খাগড়াছড়ি ‌’পিটাছড়া প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য’ রক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত যুক্তরাজ্য প্রবাসী রাসেলের

এইচ এম প্রফুল্ল, খাগড়াছড়ি : যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শিল্পের উচ্চ বেতনের চাকুরি করতেন মাহফুজ আহমেদ রাসেল। সে বিলাসবহুল করপোরেট চাকুরি ছেড়ে রাসেল খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার পূর্ব খেদাছড়া এসে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ৭৫ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তুলেন প্রাকৃতিক মিশ্র চিরহরিৎ বনাঞ্চল ‘পিটাছড়া’। সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণী ও দেশীয় উদ্ভিদের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে ‘পিটাছড়া’। বন সংরক্ষণের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন স্থানীয় শিশুদের শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও জৈব কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রকৃতি সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।


পিটাছড়া নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতি সংরক্ষণের ধারণা। ‘পিটা’ একটি বিরল পাখি এবং ‘ছড়া’ মানে পাহাড়ি জলধারা। বিলেতের আয়েশ ছেড়ে ২০১৬ সালে ম্যানচেস্টার থেকে বাংলাদেশে ফিরে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার পূর্ব খেদাছড়া প্রথমে পৌনে পাঁচ একর পাহাড়ি জমি কিনেন তিনি। পর্যায়ক্রমে পরিধি বেড়ে ৭৫ একরে পৌছেছে। এখন সেখানে বন্য প্রাণী রক্ষায় এলাকার মানুষকে করছেন সচেতন।আর পুরো ২৩ একর জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন বন্যপ্রাণীদের জন্য। আর নিজের জায়গায় নিজেই থাকেন উদ্বাস্তুর মতো।
‘পিটাছড়ায়’ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, শিক্ষা সহায়তা, মাশরুম চাষ ও জৈব কৃষির প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে পরিচালিত একটি বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থানীয়দের চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছে।
রাসেলের ‘পিটাছড়া কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি দুটি কামরা ছোট একটি ঘর। লাগোয়া বারান্দা। চারপাশ বৃক্ষ-লতাগুল্মে ঠাসা। ঘরের একপাশে মাহফুজ রাসেল নিজে থাকেন, অন্য অংশটা অতিথিশালা।
পিটাছড়ায় পাখি আর প্রাণীর দেখা মেলে।’ ইতিমধ্যে প্রকৃতি প্রেমী রাসেল বিশাল বনাঞ্চল ট্রাসে দেওয়ার জন্য আবেদনও করেছেন।
মাহফুজ আহমেদ রাসেল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা শেষে পোশাক খাতে কর্মজীবন শুরু করেন।পরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শিল্পে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন। প্যারিস, মিলান, লন্ডন ও টোকিওর মতো শহরে কাজ করলেও জীবন রাসেলকে তৃপ্ত করতে পারেনি।

পরবর্তীতে তিনি ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব কমিউনিটিতে কাজ করেন। আমাজনের অভিজ্ঞতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ‘আমাজনে গিয়ে বুঝেছি মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং প্রকৃতিরই একটি ক্ষুদ্র অংশ’। কিন্তু খাগড়াছড়ির পাহাড়ে এসে তিনি দেখতে পান—বন উজাড়, তামাক চাষের বিস্তার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের চিত্র।
প্রকৃতি প্রেমী মাহফুজ আহমেদ রাসেল মতে, ‘বন তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘নো ইন্টারভেনশন’। প্রকৃতি মানুষের চেয়ে ভালো জানে কীভাবে নিজেকে পুনর্গঠন করতে হয়।’
এই দর্শণ থেকে রাসেল গত এক দশকে এখানে গড়ে উঠেছে গর্জন, চাপালিশ, গামার, ডুমুর, বুনো আমড়া ও বিভিন্ন দেশীয় বৃক্ষের সমৃদ্ধ বনাঞ্চল।সে নিরাপদ আবাস গড়ে তুলেছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। মহাবিপন্ন এশীয় হলদে কচ্ছপ, পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ, গোলবাহার অজগর, চশমাপড়া হনুমান, কেউটে, শঙ্খিনীসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের উপস্থিতি নিয়মিত পাওয়া যায়।
বনের ঝিরি-ছড়াগুলোতে দেখা মেলে ৩০টিরও বেশি প্রজাতির পাহাড়ি ব্যাঙের।পাশাপাশি লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, বনরুই, বুনো সজারু ও চিতা বিড়ালের মতো প্রাণীরও আবাস গড়ে উঠেছে এখানে।
প্রকৃতি সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। গত ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেন।
মাহফুজ আহমেদ রাসেল বলেন, এই অর্জন একক কারো নয়। অনেক মানুষের সহযোগিতা ও আস্থার ফলেই আজকের অবস্থানে আসা সম্ভব হয়েছে।
বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি’র সংগঠক সমির মল্লিক বলেন,বন্যপ্রাণী এবং বন্যপ্রাণী ধ্বংসের বিপরীতে পিটাছড়া একটি ব্যতিক্রম উদ্যোগ। পুরো এলাকাটা যে প্রাকৃতিক বন, সেটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। যে কারণে আসলে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ এবং পাখি এবং লজ্জাবতী বানরসহ অন্যান্য যে দুর্লভ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, সেগুলো এটা আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে ও এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বন এবং বন্যপ্রাণী ধ্বংসের বিপরীতে পিটাছড়া একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী উদ্যোগ।
খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: ফরিদ মিয়া বলেন, পিটাছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ উদ্যোগ ও বন ও আশেপাশের বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এ কার্যক্রমের মাধ্যমে পিটাছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ উদ্যোগ বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রশংসনীয় অবদান রাখছে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো: আনোয়ার সাদাত মাহফুজ আহমেদ রাসেলের ‘পিটাছড়া’-কে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত আখ্যায়িত করে বলেন, সবাই বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে পাহাড়ে সবুজ বিপ্লব হবে।
প্রকৃতি প্রেমী মাহফুজ আহমেদ রাসেরের বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যোগ অন্যদের আকৃষ্ট করবে এবং মানব কল্যাণে অবদান রাখবে।