আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে কোনো পরমাণু চুক্তি ছাড়াই যুদ্ধ শেষ করে বিজয় ঘোষণা করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তার জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের কাছে এ সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। ইরান যদি পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেয়, তাহলে বর্তমান যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প আরও আগ্রহী হতে পারেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বলেছেন, ২০২৫ সালের জুনে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর তেহরানের পক্ষে পরমাণু কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভবত কঠিন হবে।
ট্রাম্পের ধারণা, ইরান এসব স্থাপনা পুনর্গঠন কিংবা গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করলে মার্কিন গোয়েন্দা সক্ষমতা তা শনাক্ত করতে পারবে। পাশাপাশি, ইরান নতুন করে এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালাতে পারে— এই আশঙ্কাই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন তিনি।
মার্কিন কর্মকর্তারা আরও ধারণা করছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিলে দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে থাকা মার্কিন নৌ অবরোধও তুলে নিতে পারেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে।’ এখন ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা। ইরান জাহাজে আরও হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প খোলা রাখবে।
তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া নিয়ে ইরানের কঠোর অবস্থান ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ কঠিন করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সাম্প্রতিক কঠোর শর্তগুলো যুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের জন্য ‘সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ’ তৈরি করা ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, ইরান মনে করে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান এবং তার প্রধান লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। এ কারণেই তেহরান আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর শুক্রবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘আচরণ সংশোধন’ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
তিনি এমন ছয়টি শর্তের কথা জানিয়েছেন, যেগুলো পূরণ হলে ইরানের বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র তার আচরণ সংশোধন করেছে বলে ধরা হবে।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— ইরান, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধ করা; ইরানকে মৌখিকভাবে হুমকি না দেওয়া; মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং সব নৌ ও বিমানবাহিনী প্রত্যাহার করা; ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেওয়া; ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের সময় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি খুব শিগগিরই শেষ হবে।’ ইরান আর বেশি দিন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি ও এটি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাব্য চুক্তি সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, প্রণালিটি ‘এই মুহূর্তে কিছুটা খোলা’ রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নেতৃত্বে অবরোধ চলছে এবং প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। তবে ইরান চাইলে সেখানে যেকোনো সময় কোনো কিছুর ওপর হামলা চালাতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।