মুক্তবাণী রিপোর্ট : দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে ঢাকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা এসেছে দুই দেশের তরফে; তবে সেজন্য ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা।
আর এর অংশ হিসেবে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখার বিষয়টি আলোচনায় আসছে। এ বিষয়টিকে বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতকে দেওয়া একটি ‘শর্ত’ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক তৌফিক এম হক।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘সহায়ক পরিবেশ’ এর সংজ্ঞায়ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো সুযোগ পাবেন না বা ওখানে বসে কোনো সংবাদ সম্মেলন করতে পারবেন না, রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারবেন না।
“এটা যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশ মনে করবে যে অনুকূল একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আলাপ-আলোচনা বা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে যে টানাপড়েন চলছে, তা স্বাভাবিক করতে গেলে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার বিকল্প নাই।
আর এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের দিকে ইংগিত করে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা তখনই হতে পারে, যখন দুইজন কোনো একটা জায়গায় দেখা হওয়ার সুযোগ পায়।”
১০ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি।
ভারতীয় হাই কমিশনার বারবার বলছেন, দুদেশের মধ্যে থাকা সব সমস্যাই সমাধান করা সম্ভব, যদি দুই প্রধানমন্ত্রী মুখোমুখি বসেন।
ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের এসব বৈঠকের পর দিল্লি গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। সেখানে ঢাকার আলাচনার বিষয়গুলো অবহিত করেছেন।
এর মধ্যে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন।
সব কিছু মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে–প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি ভারত সফরে যাবেন?
ব্রিকস সম্মেলনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে দিল্লি সফরের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দুটি আমন্ত্রণ রয়েছে। এর একটি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সফরের; অন্যটি বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার।
ভারত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়; বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ব্রিকসের আয়োজনে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকার বলছে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ব্রিকসের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় সফরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনারের সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিংয়ে দুই আমন্ত্রণের প্রসঙ্গ তুলে ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চান এক সাংবাদিক।
জবাবে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের দাওয়াত দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছে চেয়ারপারসন অব বিমসটেক, এই পার্থক্যটা আপনারা বোঝার চেষ্টা করুন।
“এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছিলেন এবং সেই চিঠিটি আমাদের সরকার গঠনের দিন হস্তান্তর করা হয়েছিল, সেখানে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। দিন তারিখ ঠিক হয়নি, কিন্তু আমন্ত্রণ একটা আছে সেখানে। সেটা আমরা দেখব কখন হয়।”
জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া ভারতের আমন্ত্রণ সরকার পর্যালোচনা করছে এবং সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।
কিন্তু অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিন ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর দৃশ্যতঃ কিছুটা কঠোর অবস্থানে চলে গেছে বাংলাদেশ সরকার।
মঙ্গলবার নয়া দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তবে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
জয়সওয়াল বলেন, “আমরা এর আগে গেল ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এরপর ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
“এসব আমন্ত্রণের বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া গেলে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।”
সংশয়, সম্ভাবনা:
সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
কেউ কেউ সম্ভাবনা ‘খুবই কম’ বললেও অন্যদের মতে, আলাপ-আলোচনা ঠিকমত এগোলে সফরটি এখনও সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছিলেন, ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের অপেক্ষায় আছেন।
“আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই যে—ভালো সম্পর্ক। আর ভালো সম্পর্ক হলে উইন-উইন সিচুয়েশন। এটা আমাদের ঐতিহাসিকভাবে আছে, এটা তো আপনি বদলাতে পারবেন না। প্রতিবেশী তো বদলাতে পারবেন না, ইতিহাস বদলাতে পারবেন না।”
আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমি সবসময় বলি, আমরা শুধু সীমান্ত ভাগাভাগি করি না, আমরা স্বপ্নও ভাগাভাগি করি। আমরা তো স্বপ্ন ভাগাভাগি করি, তাই তো?
“আমার মনে হচ্ছে, আগামী দিন খুবই ভালো হবে। ইস্যুজটা শর্ট-আউট করতেই হবে, দুদিক থেকে। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী।”
হাই কমিশনারের এই বার্তার মধ্যে ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখতে পাচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, “হাই কমিশনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেন। বৈঠক করার পরে যে ধরনের কথাবার্তা বলেছেন, এটা দেখে মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে যে, তারা চাচ্ছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই ব্রিকস সম্মেলনে যান।
“এবং এরপর তাদের ‘র’ প্রধান এসেছিলেন, তিনি দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সাথে, এটা রুটিন বললেও আমি মনে করি যে, এটা তাদের দিক থেকে মনে হচ্ছে তারা আগ্রহী। এখন এটা আমাদের দিক থেকে আমাদের সিদ্ধান্ত।”
আলাপ-আলোচনার ‘সুযোগ’ কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি হুমায়ুন কবির বলেন, প্রতিবেশী হিসাবে দুই দেশের স্বার্থ ‘খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িত’।
“সেক্ষেত্রে যদি এই ভিজিটের পাশাপাশি ভালো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ব্যবস্থা করার সুযোগ থাকে, সেটা চিন্তা করে দেখা যেতে পারে।”
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের (এসআইপিজি) পরিচালক অধ্যাপক এসকে তৌফিক এম হক মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাই কমিশনারের বৈঠক আসলে ছিল শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে উত্তাপের পর দুই পক্ষের বার্তা আদান-প্রদানের সাক্ষাৎ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মঙ্গলবার দিল্লিতে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মঙ্গলবার দিল্লিতে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
“মনে হয়েছে, বাংলাদেশ খুব শক্তভাবে তার অবস্থানটা জানিয়েছে। ভারতীয় দিক থেকে সেই অবস্থানটা জানার পরে তারা দিল্লিতে বা তাদের মূল নীতিনির্ধারণী মহলে সেটা অবহিত করেছে।”
পরিস্থিতি যেখানে দাঁড়িয়েছে, তাতে সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের খুব একটা সম্ভাবনা দেখছেন না অধ্যাপক তৌফিক এম হক।
সফর নিয়ে সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “উনি খুব স্পষ্ট ভাষায়, কিছুটা কড়া ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি ব্রিকসে, বিমসটেকের সভাপতিকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং সেটা বাংলাদেশ খুব পছন্দ করেছে বা এটা বাংলাদেশের বর্তমানের নীতিনির্ধারক মহল এটাকে পজিটিভলি আগাবে, এরকম উনার বলার টোনে মনে হয়নি।
“আমি মনে করি যে, ব্রিকসের সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ একেবারেই কমে গেছে। অফিশিয়ালি এখনও কিছু বলা হয়নি, কিন্তু আমার মনে হয় একেবারেই কমে গেছে।”
এখন দ্বিপক্ষয়ী সফরের যে আমন্ত্রণটি রয়েছে, সেটি ধরে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পরিকল্পনা করবে বলে মনে করছেন এই বিশ্লেষক। তবে সেখানেও ‘কিন্তু’ আছে।
“তার আগে ওই যে, পরিবেশের বিষয়টা আবার আসবে। বাংলাদেশ নিশ্চিত হতে চাইবে যে, প্রধানমন্ত্রী ভিজিটের আগে বা পরে (শেখ হাসিনাকে) এই ধরনের কোনো সুযোগ ভারত দিচ্ছে না। এই পরিবেশটুকু নিশ্চিত হলে বাদবাকিটা আগাবে।”
আর এক্ষেত্রে আশাবাদী হতে চান অধ্যাপক তৌফিক। তিনি মনে করেন, ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির যে শর্ত বাংলাদেশ দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত ভারত তা মেনে নেবে। অর্থাৎ, দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লাগাম টানতে ভারত হয়ত রাজি হবে।
“এটা মেনে না নেওয়ার কোনো কারণ নাই। এই রকম একজন ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কতো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। আমার মনে হয়, ভারতের নীতিনির্ধারকরাও এটাকে ইতিবাচকভাবে নেবেন এবং এভাবে সম্পর্ক এগোনোর সম্ভাবনা দেখি আমি।”
ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নভাবে দেখছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, “এটা নির্ভর করে, সফর থেকে কী আশা করেন তার ওপর। কথা আসতে পারে, এটাতো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক না, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সময় কতটুকু পাওয়া যাবে, না যাবে…। তবে আমার কাছে মনে হয়, এরও সমাধান আছে।
“এখন ভারতের হাই কমিশনার দিল্লি গেছেন। ওখানে তারা কী আলোচনা করবেন সেটা একটা বিষয়। আমার মনে হয়, ফর্ম্যাট নিয়ে দুই পক্ষই আলোচনা করতে চায়, আর সেটা নিয়ে আলোচনা করাও যায়। এখানে যতটা সৃজনশীলতা নিয়ে অনুসন্ধান করা যায়, তা করতে পারলে মন্দ হয় না।”
প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি মনে করি যে, এখানে সমস্যা ও স্বার্থ দুটোই আছে। আমাদের দিক থেকে দেখতে হবে, আমরা সমস্যা সমাধানের মত কিছু পাই কি-না, তেমন সুযোগ তৈরি হয় কি-না। যদি সেটা হয়, তাহলে যাওয়ার কথা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
“কিন্তু সেখানে যদি দেখা যায় যে, কোনো সমস্যার সমাধান হবে না, তখন ভিন্ন চিন্তা অবশ্যই থাকতেই পারে।”
যেভাবে এখানে এল বাংলাদেশ ও ভারত:
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দিয়ে আসছিল।
তারেক রহমানের নতুন সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, সেখানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার কথাই বলা হয়েছিল। ঢাকার তরফেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরুর বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে ৫ অগাস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার অংশগ্রহণ ঘিরে দুদেশের মধ্যে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়।
ওই সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হন শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি তোলেন এবং বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছার কথা জানান।
আদালতের দৃষ্টিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দাণ্ডিত ‘পলাতক আসামি’ শেখ হাসিনা যাতে দিল্লিতে বসে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেজন্য আগেই ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানটির আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, এটি একটি বেসরকারি সংগঠনের আয়োজন এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আর ওই অনুষ্ঠানে যে মতামত প্রকাশ করা হতে পারে, ভারত সরকার তাতেও কোনো সমর্থন দিচ্ছে না।
কিন্তু তারপরও দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন হতে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ সরকার। ‘দণ্ডিত পলাতক আসামিকে’ বক্তৃতার সুযোগ করে দেওয়াকে সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “দুঃখজনকভাবে, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী অভিযুক্ত অপরাধী হাসিনাকে ফেরতের বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশের বারংবার পাঠানো অনুরোধের কোনো জবাব এখনও মেলেনি।
“এর বিপরীতে, যে কোনো অজুহাতেই হোক, তাকে প্রকাশ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া আমাদের জনগণের অনুভূতিতে গভীর আঘাত এবং বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।”
এরপর শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল আবারো বলেন, ওই আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে যা কিছু বলা হয়েছে, তাও সমর্থন করে না সরকার।
ঢাকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয় নতুন ভারতীয় হাই কমিশনার ত্রিবেদীর।
ওই বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়ার পাশাপাশি তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে বলেছে ঢাকা।
মঙ্গলবার দিল্লির ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়ালকে এ বিষয়ে আবারো প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে জানতে চান একজন সাংবাদিক। শেখ হাসিনার মামলার নথি ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছে কিনা, সে প্রশ্নও তিনি করেন।
জবাবে জয়সওয়াল বলেন, “এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। ভারতের নিজস্ব প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য থাকলে জানিয়ে দেওয়া হবে।”