শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর বিএনপির দল পুনর্গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে দল পুনর্গঠনে মনোযোগ বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে যে কোনো সময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি বিএনপির জেলা, মহানগরসহ তৃণমূলের কমিটিগুলো ঢেলে সাজানো হবে। খুব শিগগির একাধিক টিম তৃণমূল পর্যায় সফর করতে পারে। এভাবেই তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত গতি আনা হবে।

দলটির নেতারা বলেন, সংখ্যগরিষ্ঠ দল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে, স্থায়ী কমিটির আরও দুই নেতা এই পদে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তাদের ঘনিষ্টজনদের কাছে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর ধাপে ধাপে পুনর্গঠন কাজ শুরু করা হবে। বিশেষ করে, বিএনপির জেলা ও মহানগর এবং কেন্দ্রীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনে জোর দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর দল পুনর্গঠনের গতি আরও বাড়ানো হবে। কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদেও রদবদল আনা হতে পারে- এমন আলোচনা জোরালো হচ্ছে। তবে এ নিয়ে দলে কারও কারও দ্বিমত রয়েছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে- ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যেখানে দেশকে রেখে গেছেন- ভঙ্গুর রাষ্ট্র এবং অর্থনীতি; এই দেশ ঠিক করতে হলে আরও সময়ের প্রয়োজন। ফলে মন্ত্রীদের কর্মের মূল্যায়নে ছয় মাস যথেষ্ঠ নয়। সেক্ষেত্রে এক মন্ত্রণালয়ে একজন- এভাবে মন্ত্রীদের চাপ কমানো যেতে পারে বলে তাদের মত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘দল পুনর্গঠনে মনোযোগ দেওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা করতেই হবে।’

মন্ত্রিসভায় এই মুহূর্তে ‘রদবদল’ করা ঠিক হবে না। কারণ, দেশের যে পরিস্থিতি তাতে মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে আরও দুই-তিন মাস অপেক্ষা করতে পারলে ভালো হবে। অর্থাৎ প্রথম ধাপে ‘রদবদল’ নয়, বরং কাজের মূল্যায়নের জন্য আরও তিন মাস ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’ করা যেতে পারে বলে অনেকের মত।

দল পুনর্গঠন বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘শিগগিরই দল পুনর্গঠন করতে হবে। দলের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করতে হবে।’

দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলেন, যেহেতু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে দল ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও নেতৃত্বে পরিবর্তন আবশ্যক; সেহেতু বিএনপির রাজনীতিতে এটি এক নতুন সমীকরণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ায় দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী পর্যায়ে পদে সংযোজন-বিয়োজন আসন্ন হয়ে পড়েছে। জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘পুনর্গঠন বা সংযোজন-বিয়োজন দলের অভ্যন্তরীণ রুটিন ওয়ার্ক। তারেক রহমানের সঙ্গে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সাক্ষাৎ চলমান সাংগঠনিক প্রক্রিয়া; যার মাধ্যমে সংগঠন শক্তিশালী ও গতিশীল হয়। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও শিগগিরই অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোতে নতুন কমিটি দেওয়া হতে পারে।’

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, আশার কথা হলো ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূলকে সুসংগঠিত করতে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভা শুরু করেছেন। এরই অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী বিভাগের আওতাধীন সব জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে গুলশানে তার কার্যালয়ে মতবিনিময় করেছেন তারেক রহমান। এর আগে তিনি বিভিন্ন জেলা-মহানগর নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন।

এদিকে নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো হয়েছে। বেশকয়েকদিন আগে স্বেচ্ছাসেবক দল শীর্ষ নেতাদের ডেকেও একইভাবে বিদায় জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে সংঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও শপথ অনুষ্ঠানের পর দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া জোরালো করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মাধ্যমে দলের গতি আনতে চায় বিএনপি। সেই লক্ষ্যে মূলত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা, অভ্যন্তরীণ সমস্যা, কমিটি সংক্রান্ত জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে নেতাদের কাছ থেকে জানতে চাচ্ছেন তারেক রহমান।

দলটির বেশকিছু নেতা মনে করছেন, জাতীয় কাউন্সিলের আগেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আরও তরুণ নেতা, বিশেষ করে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের অনেককে সংগঠনগুলোর শীর্ষ পদে নিয়ে আসতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যান। সেই লক্ষ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করার নির্দেশনা দিচ্ছেন বিভিন্ন মতবিনিময়সভায়।

দলীয় সূত্র মতে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য তৃণমূলের জনসমর্থন যাচাইয়ের বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিভিন্ন এলাকায় এমপি ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে স্থানীয় কোন্দল এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এই দ্বন্দ্ব নিরসন করে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিভাগভিত্তিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হচ্ছে। উদ্দেশ্যে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায়ে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা।

বিএনপির পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দলকে নতুন করে সাজানো হবে।

গত রবিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল রেডিসনে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক জেলা কমিটি করে ‘মডেল’ অনুযায়ী সারাদেশে দলকে শক্তিশালী করা হবে। এ ছাড়া দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে এ ধরনের কেউ যাতে নেতৃত্বে আসতে না পারেন, সেদিকে লক্ষ রাখার জন্য তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা দেন। শিক্ষিত-মার্জিত এবং দল ব্যবহার করে নিজ স্বার্থ হাসিল করবে না এমন নেতাদের মূল্যায়নের কথা বলেন তিনি। চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপি এবং বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৭০০ নেতা বৈঠকে অংশ নেন।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলে থাকা এবং পরবর্তীতে সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় বিএনপির অনেক জেলা, উপজেলা ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে আছে। কাউন্সিল না হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব উঠে আসছে না। তাই তরুণ ও নিবেদিত নেতৃত্বকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসার চিন্তা করছে হাইকমান্ড। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরপরই দল পুনর্গঠনে মনোযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সময়ের দাবি। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণে দ্রুত ভেঙে দেওয়া হতে পারে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো। এতে তৃণমূল পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিং নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন বিএনপি নেতারা। ২০২২ সালের শুরুর দিকে লন্ডনে থাকাকালে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপিকে ‘পুনর্গঠনের মডেল’ হিসেবে দাঁড় করাতে বিশেষ একটি রূপরেখা দেন তারেক রহমান। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তখন দায়িত্ব দেওয়া হয় দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খানকে (বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী)। তখন বিষয়টি নিয়ে তোড়জোড় চলে। নগর বিএনপি নেতাদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেন আহমেদ আযম খান। দল পুনর্গঠনে কয়েকটি উপকমিটি করা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যক্রম চালানো হলেও এক পর্যায়ে এটি থমকে যায়। এখন সেই প্রক্রিয়া অনুসরণে আবারও বন্দরনগরীতে দলকে সাজানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, ‘বিএনপির সম্মেলন হবে। তাই তৃণমূল পর্যায়ে দলকে পুনর্গঠনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা হবে।’

প্রসঙ্গত, বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা। এসব কাউন্সিলের মাধ্যমে বিভিন্ন কমিটি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, যেগুলোর মেয়াদ থাকে তিন বছর। এ ছাড়া বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর ১১টির মধ্যে ৯টি কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, দলের বড় কোনো কর্মসূচি না থাকায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও গতি কমেছে। অনেক নেতাকর্মী রাজনীতিবিমুখ অবস্থায় আছেন। তাই এখন সংগঠনকে আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যে যাই বলুক সংগঠনে সাংগঠনিক দুর্বলতা কিছু আছে; যা কাটিয়ে দ্রুত সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপির অভিভাবক তারেক রহমান।

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, ‘শিগগিরিই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয় করার লক্ষ্যে নতুন নেতৃত্বে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। ধারণা করা যায়, চলতি মাসেই নতুন কমিটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’