তীব্র গ্যাস সংকটে অচল হয়ে পড়ছে দেশের শিল্প খাত। পত্রিকায় খবরে প্রকাশ-নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও হবিগঞ্জের মতো প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলে শত শত কলকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ খাতে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। একদিকে জ্বালানির অভাবে কারখানার চাকা ঘুরছে না, অন্যদিকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ইতোমধ্যেই সাভার-আশুলিয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন এবং লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন সময় পার করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণ, গ্যাস বিল ও শ্রমিকের বেতন পরিশোধের চিন্তায় দিশেহারা শিল্পোদ্যোক্তারা। বস্তুত শিল্পকারখানার জন্য বরাদ্দকৃত গ্যাসের বেশির ভাগ বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরবরাহ করায় সংকটে পড়েছে দেশের পুরো শিল্প খাত।
আমরা মনে করি, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার পেছনে জ্বালানি খাতের কারিগরি ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে শুরু হওয়া এই বিপর্যয় ১১ আগস্ট আরামকোর ‘মস টাইপ’ কার্গো পৌঁছানোর পর আরও ঘনীভূত হয়। ওই কার্গোটিকে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট খালাস করতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চার বছর আগেও একই ধরনের কার্গো থেকে এলএনজি খালাসের নজির থাকা সত্ত্বেও বর্তমান কারিগরি দ্বন্দ্ব ও আবহাওয়ার অজুহাতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের ক্রয় প্রক্রিয়া ও চুক্তি ব্যবস্থাপনার দুর্বল দিককেই উন্মোচিত করে। কোন টার্মিনালে কোন কার্গো খালাসযোগ্য, তা আগে থেকে নিশ্চিত না করায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সমন্বয়হীনতা, যা শিল্প খাতকে সংকটে ফেলে দিয়েছে।
মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। যদিও জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিগত সরকারগুলোর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এই খেসারত দিতে হচ্ছে এবং পরিস্থিতি সামলাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন; তবে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আশ্বাসে বর্তমান সংকট কাটবে না। দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান সমাধান না এলে শ্রমিকদের এই কর্মহীনতা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।
কাজেই এই দুর্যোগ থেকে উত্তরণে সরকারকে অনতিবিলম্বে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। পেট্রোবাংলা, আরপিজিসিএল, এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট গ্রুপের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা অবিলম্বে নিরসন করা প্রয়োজন। কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত মধ্যস্থতার মাধ্যমে বহির্নোঙরে আটকে থাকা কার্গো কিংবা বিকল্প উৎস থেকে দ্রুততম সময়ে গ্যাস খালাসের ব্যবস্থাও করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাসের ন্যূনতম চাপ নিশ্চিত করা এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। সরকার দ্রুততার সঙ্গে এ সংকট অতিক্রম করে দেশের অর্থনীতি ও শ্রমজীবী মানুষদের রক্ষা করবে-এটাই প্রত্যাশা।