নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর সিংহভাগ ডাকাতির ঘটনায় একটি চক্র জড়িত বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে রাজধানীতে ডাকাতির ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সম্প্রতি উত্তরা এলাকায় ব্যাংকে জমা দিতে যাওয়ার পথে ডিএল পেট্রোল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ঘটনার সময় আসামিরা র্যাবের পোশাক (ভেস্ট), আইডি কার্ড, ওয়াকিটকি দেখিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেয়।
প্রতিষ্ঠানটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বোন, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হকের ছোট ছেলে তাসীন আক্তার হকের বলে জানা গেছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন– মো. ইলিয়াস শিকদার (৩৬), জাফর (৩৬), মো. রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল (৩৪), মিন্টু রাড়ী (২৩) ও সাগর বাড়ৈ (৪০)।
এসময় তাদের কাছ থেকে ৪টি ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল, ৬টি ম্যাগাজিন, ২১ রাউন্ড গুলি, লুণ্ঠিত নগদ ১২ লাখ টাকা, র্যাবের ভুয়া পরিচয়পত্র, ভেস্ট, ক্যাপ, ওয়াকিটকি, হাতকড়া, বিভিন্ন নম্বর প্লেট, একটি মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, গত ৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তরা পূর্ব থানাধীন ডিএল ফিলিং স্টেশনের চারজন ১ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার উদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা বিমানবন্দর থানাধীন ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের ক্রাউন প্লাজার কাছে বিআরটি লেনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা একদল ডাকাত তাদের গতিরোধ করে। অস্ত্র ও চাপাতি দিয়ে ভয় দেখিয়ে ও আঘাত করে তাদের কাছ থেকে টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর ডিবি ও উত্তরা ক্রাইম বিভাগ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ইলিয়াস শিকদার ও জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইলিয়াস শিকদারের বন্দর থানা এলাকার ভাড়া বাসায় অভিযান পরিচালনা করে র্যাব লেখা ৩টি ভেস্ট ও ২টি ক্যাপ, ২টি নম্বর প্লেট, র্যাবের মনোগ্রামযুক্ত ৪টি ভুয়া পরিচয়পত্র, ৩টি ওয়াকিটকি সেট, ৪ জোড়া হাতকড়া, ২টি ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল, ৩টি ম্যাগাজিন ও ৬ রাউন্ড পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাতুয়াইল এলাকা থেকে রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল ও যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় এলাকা থেকে মিন্টু রাড়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবিপ্রধান বলেন, রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেলের ভাড়া বাসা থেকে ডাকাতির লুণ্ঠিত টাকার মধ্যে নগদ ৩ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয় এবং মিন্টু রাড়ীর ভাড়া বাসায় অভিযান পরিচালনা করে র্যাব লেখা ৪টি ভেস্ট, স্টিলের ২টি ও অফসেট পেপারের ৪টি নম্বর প্লেট, র্যাবের মনোগ্রামযুক্ত ৪টি ভুয়া পরিচয়পত্র, ওয়াকিটকি সেট ও চার্জার, ৩ জোড়া হাতকড়া, ২টি ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল, ৩টি ম্যাগাজিন ও ১৫ রাউন্ড পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়।
পরে রবিউল ও মিন্টুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শ্যামপুর থানাধীন পোস্তগোলা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে সাগর বাড়ৈকে তার ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে ডাকাতির লুণ্ঠিত নগদ ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তারদের ডাকাতির ঘটনায় সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার ও লুণ্ঠিত অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার সাগর বাড়ৈ তার ভাগে ৯ লাখ টাকা পেয়েছিল, তবে সেই টাকা সে ব্যয় করতে পারেনি। ডাকাতির টাকা বিভিন্নজনের মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ হয়েছে। এর মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারীরা বড় অংশ নিয়েছে এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদানকারীদের ভাগ দেওয়া হয়েছে।
ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরীক্ষা করে দেখা গেছে কোনোটি পুলিশের চুরি হওয়া অস্ত্র নয়, বরং অবৈধভাবে সংগৃহীত।
ঘটনার মূলহোতার পরিচয় পাওয়া গেছে কি না– জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, মূল অর্গানাইজার বা মাস্টারমাইন্ড এখনো পলাতক। তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে বিস্তারিত পরিকল্পনা জানা যাবে। তবে ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কোনো পূর্বপরিচয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। সে পেশাদার ক্রিমিনাল হিসেবে এটি সংঘটিত করেছে। এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা সরাসরি ঘটনার দিন সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল।
অপরাধীরা নির্দিষ্ট দিন বা স্থান কীভাবে বেছে নিয়েছিল– জানতে চাইলে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পেট্রোল পাম্প থেকে জমা হওয়া টাকা ব্যাংক ছুটির কারণে কয়েকদিন জমা রাখা হয়েছিল। বন্ধের দিনগুলোতে বিপুল পরিমাণ টাকা জমার বিষয়টি জেনেই তারা এই ছিনতাই বা ডাকাতির পরিকল্পনা করে।
আসামিদের বিরুদ্ধে আগের কোনো অপরাধের রেকর্ড আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রেপ্তাররা পেশাদার অপরাধী ও একাধিক মামলার আসামি। সাগর বাড়ৈয়ের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। পলাতক মূলহোতার বিরুদ্ধে ২০টিরও বেশি মামলা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ মনে করছে, এই গ্যাংটিকে পুরো ডিসম্যান্টল (ছত্রভঙ্গ) করতে পারলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।