দীর্ঘ পাঁচ মাসেরও বেশি সময় নেতৃত্বশূন্য থাকার পর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চেয়ারম্যান এবং দুই কমিশনার দায়িত্ব নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে দুদকের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অচলাবস্থার অবসান হয়েছে। ঝুলে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গতি ফেরার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
নতুন কমিশন কতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে পারে সেটাই দেখার বিষয়। নতুন কমিশন বলছে, অভিযোগের বিষয়বস্তু ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার অবস্থান বা ব্যক্তির প্রভাব বিবেচনা করা হবে না।
দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কমিশন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা অভিযোগ, অনুসন্ধান ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জেনেছে। আদালতে বিচারাধীন গুরুত্বপূর্ণ মামলা এবং প্রশাসনিক ও আইনি বিষয় সম্পর্কে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছে।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়াও ইতিবাচক উদ্যোগ। আমরা আশা করব, ফাইল খোলা বা বৈঠক করার মধ্যে দুদকের কাজ সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, মানসম্মত তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই কমিশন তার সক্ষমতা প্রমাণ করবে।
দুদকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে। এর কিছু বাস্তব কারণ আছে। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে দুদকের ভূমিকা বদলে যায়। ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের তৎপর হতে দেখা যায় না। বরং সংস্থাটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া যায়। নতুন কমিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে এই পুরোনো ধারণা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বের করে আনা।
এ জন্য অভিযোগকারী বা অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে তাকালে চলবে না। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে। ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ বাছাইয়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুদকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অভিযোগ যায়। তার মধ্য থেকে অল্পসংখ্যক অভিযোগের অনুসন্ধান করা হয়। এই বাছাই কীভাবে হয়, তার সুস্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া থাকা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুদকের নিজস্ব সক্ষমতা ও স্বাধীনতা। তারা যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে না পারে তা হলে দুর্নীতির লাগাম টানা যাবে না। সংস্থার আইনগত ক্ষমতা কেবল কাগজে থাকলে হবে না, বাস্তবেও এর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আমরা নখদন্তহীন দুদক দেখতে চাই না। নতুন চেয়ারম্যান বলেছেন, কমিশনের ওপর কোনো চাপ নেই, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কাজ করা হলে দুদকের প্রতি মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হতে পারে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রশ্নে কমিশন অভিন্ন মানদণ্ড বজায় রাখছে কি না সেটা দেখার বিষয়। কমিশনের কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা দরকার।
দীর্ঘ নেতৃত্বশূন্যতার পর দুদকে যে নতুন কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। দুর্নীতি দমনের কাজে আমরা দুদককে সফলই দেখতে চাইব। তবে দুর্নীতি দমনের সব দায়িত্ব কেবল দুদকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।
দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে। প্রশাসন, সরকারি কেনাকাটা, রাজস্ব ব্যবস্থা, ব্যাংকিং, ভূমি, আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে নানা সেবা খাতে দুর্নীতি হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতি করার পর শাস্তির ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়। দুর্নীতির পথও রুদ্ধ করতে হবে।
দুর্নীতি দমনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সুবিধাভোগীদের যে চক্র তৈরি হয়েছে সেটা ভাঙার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।