বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

কিশোর শাহেদের তৈরি ‘ঘুষ.সাইট’ নিয়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক : মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে বারবার ঘুষ দাবির মুখে পড়তে হয়েছিল পরিবারটিকে। অন্যদিকে নিজের পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও ঘটেছিল একই অভিজ্ঞতা।

প্রশাসনের পদে পদে থাকা এ ঘুষের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ থেকে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ।

ভুক্তভোগীরা যাতে নাম-পরিচয় গোপন রেখে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন, সে জন্য তিনি তৈরি করেছেন ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইট।
এতেই তোলপাড় সৃষ্টি হয় সারাদেশে।

শাহেদ শরীফ আহমেদ ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে।
পড়ালেখা করছেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে। তার বাবা শরীফুল ইসলাম (শামীম) আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন।
তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়।

শাহেদের মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান।

প্রভিডেন্ট ফান্ড তুলতে ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ:

শাহেদের পরিবার জানায়, চাকরির ১৩ বছরের মাথায় আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় সাত লাখ টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আট হাজার টাকাসহ মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। এছাড়া কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আট লাখ টাকার জন্য শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্টরা এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। টাকা না দিলে ফাইল আর এগোবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।

যেভাবে তৈরি হলো ‘ঘুষ.সাইট’:

সাইটটি তৈরির মূল কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তীব্র যন্ত্রণার কথা জানায় শাহেদ শরীফ আহমেদ। তার ভাষ্য, আম্মুর পেনশনের ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছিল। এছাড়া দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গেলে ফাইল আটকে রেখে ১৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ হয়ে যায়। এ ক্ষোভ থেকেই ওয়েবসাইটটি বানাই।

ভারতের একটি সাইট দেখে অনুপ্রেরণা পাওয়ার পর মাত্র দুই ঘণ্টার কোডিংয়ে ওয়েবসাইটটির কাঠামো তৈরি করেন শাহেদ। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি অনলাইনে ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের কাজ শিখেছেন। পরে তার বন্ধু ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহায়তায় ডোমেইন কিনে ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি লাইভ করা হয়। সব মিলিয়ে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ ডলার অর্থাৎ ১০ হাজার টাকার বেশি।

নয়দিনে ৩৩২ কোটি টাকার ঘুষের অভিযোগ:

ওয়েবসাইটটি চালু হওয়ার মাত্র নয়দিনের মাথায় গত শনিবার দুপুর পর্যন্ত নয় হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। যেখানে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা। বর্তমানে মডারেশন টিম নিয়ম মেনে অভিযোগগুলো পর্যালোচনা ও ড্যাশবোর্ড থেকে ফিল্টার করে ওয়েবসাইটে লাইভ করছে।

আইনি ঝুঁকি এড়াতে নাম গোপন:

অভিযোগ যাচাই ও স্ক্রিনিং করার জন্য তাদের চার সদস্যের একটি মডারেশন টিম রয়েছে। সাইটটি তৈরির পর কোনো হুমকি পাচ্ছেন কি না বা নিরাপত্তার আশঙ্কা রয়েছে কি না জানতে চাইলে শাহেদ বলে, এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ কোনো হুমকি পাইনি। শুরুতে সাইটটি এত ভাইরাল হবে তা ভাবিনি, ভেবেছিলাম সিভিতে যুক্ত করব। বর্তমানে আইনি ঝুঁকি এড়াতে ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে লিগ্যাল টিম গঠন বা সরকারি সমর্থন পেলে পূর্ণ তথ্য যুক্ত করা হবে।

শাহেদ আরও বলে, আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারের টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সবাইকে জানানো। সোজা কথায়, ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনা, যেন সাধারণ মানুষ সেবা পেতে কোনো বাধার মুখে না পড়েন।

পরিবার ও প্রশাসনের বক্তব্য:

শাহেদের বাবা শরিফুল ইসলাম শামীম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের মুখে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলেছি। কিন্তু বাকি ১০ লাখ টাকা পেতে এক লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে টাকা না দিলে কাজ হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জেদ ধরেছি, ঘুষ না দিয়েই টাকা তুলব। ছেলের এ উদ্যোগে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

এদিকে অভিযুক্ত সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মো. মজিবুর রহমান ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, কেউ আমার কাছে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। কাগজ নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দিই।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীন বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা আমাকে কিছু জানায়নি। কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। একই সঙ্গে তিনি বকেয়া টাকা দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তরুণদের এ উদ্যোগ আমাদের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য এলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আইনি পদক্ষেপ নেবে।

টিআইবি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহ-সভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুষের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পদে পদে ছড়িয়ে পড়া ঘুষের চিত্র এ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সরকার যদি প্রযুক্তি নির্ভর এ স্বচ্ছতার পদক্ষেপগুলো কাজে লাগায়, তবে সাধারণ মানুষ চরমভাবে উপকৃত হবে।