শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি

বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘মব সন্ত্রাস’ এখন এক আতঙ্কের নাম। মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। যার প্রভাবে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এখন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে ও ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে মব সন্ত্রাস তৈরি করা হচ্ছে, যা খুবই ভয়াবহ।

একটি সভ্য ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজে বিচার করার অধিকার কেবল রাষ্ট্রের এবং আদালতের। কিন্তু যখন জনতা নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, অভিযোগের ভিত্তিতেই কাউকে পিটিয়ে হত্যা করে কিংবা সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়, তখন সেটি শুধু একটি ব্যক্তির ওপর হামলা নয়- রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপরও সরাসরি আঘাত। গত আগস্ট মাসে দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে অন্তত ২৮ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হওয়ার তথ্য গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগ্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে অন্তত ৫৩টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, অভিযুক্ত ব্যক্তি আদৌ অপরাধী কি না- এসব যাচাইয়ের আগেই জনতার হাতে মানুষের জীবন চলে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মব সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর মধ্যে বিচারবহির্ভূত মানসিকতার বিস্তার। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা বিচারব্যবস্থার আশ্রয় না নিয়ে নিজেরাই শাস্তি দিতে পারে, তখন সমাজে ভয়, প্রতিহিংসা ও বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে। নিরপরাধ মানুষও গুজব বা ভুল অভিযোগের শিকার হতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি অপপ্রচার মুহূর্তেই জনতাকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে। ফলে মব সহিংসতা রোধে গুজব প্রতিরোধ এবং দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও জরুরি। আগস্ট মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যান্য তথ্যও সমান উদ্বেগজনক। নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৮৭টি লাশ উদ্ধার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় বহু শ্রমিকের মৃত্যু, নারী ও কন্যাশিশুর ওপর ব্যাপক নির্যাতন এবং শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। পারিবারিক সহিংসতা থেকে শুরু করে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন- সব ক্ষেত্রেই কার্যকর প্রতিরোধ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অপরাধের পর মামলা নেওয়া নয়; অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। মব সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে যারা মব তৈরি করে, উসকানি দেয় কিংবা হামলায় অংশ নেয়, তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আইনের শাসন দুর্বল হলে মব শক্তিশালী হয়। তাই প্রতিটি গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দ্রুত বিচার এবং শাস্তির দৃশ্যমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, রাষ্ট্র তাকে বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম। মানুষের জীবন কোনো গুজব, সন্দেহ কিংবা জনরোষের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। মব সহিংসতার বিরুদ্ধে এখনই কঠোর অবস্থান না নিলে এটি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে। সভ্য সমাজের পথ একটাই- অভিযোগের বিচার হবে আদালতে, রাস্তায় নয়; আইন প্রয়োগ করবে রাষ্ট্র, উত্তেজিত জনতা নয়।