শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২১ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২২ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে দেশ

প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার প্রসারে আমাদের দৈনন্দিন জীবন যেমন আরামদায়ক হয়েছে, তেমনি এর বিপরীতে ঘনীভূত হচ্ছে এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট। কায়িক শ্রমের তীব্র অভাব এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে ধাবিত করছে অসংক্রামক ব্যাধির মরণফাঁদের দিকে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৩৬ বছরের এক আফতাব শেখের করুণ বাস্তবতা-কৃষিকাজ ছেড়ে মুদি দোকানে দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং পরবর্তীকালে রাতে শারীরিক পরিশ্রমহীন প্যাডেলবিহীন রিকশা চালানোর অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। ফলে অকালেই তার হার্টে দুটি ব্লক ধরা পড়ে। এটি আমাদের অসচেতনতা এবং স্থবির জীবনযাত্রার একটি মাত্র উদাহরণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ও গবেষণায় দেখা গেছে, কায়িক শ্রমের অভাবে বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষ-যা মোট জনসংখ্যার ২৯ শতাংশ-হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, উচ্চরক্তচাপ, ক্যানসার ও স্থূলতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, কায়িক পরিশ্রমের অভাবে রক্তনালিতে চর্বি জমে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, যা করোনারি আর্টারি ডিজিজ ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি শরীরচর্চাহীন অলস জীবনযাপনের ফলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গিয়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস তৈরি হয় এবং মেটাবলিজম ধীর হয়ে শরীরের ওজন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও স্মৃতিভ্রংশের মতো মানসিক ও স্নায়বিক জটিলতারও জন্ম দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশু-কিশোরদের কায়িক শ্রমহীনতা এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন আসক্তি। আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোন, টেলিভিশন ও গেমিং ডিভাইসে অপচয় করে। নগরীতে খেলার মাঠের তীব্র সংকট এবং জলাশয় ভরাটের কারণে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কাবাডি, গোল্লাছুট ও সাঁতারের মতো কায়িক খেলাগুলো হারিয়ে গেছে। ফলে শৈশব থেকেই চোখের সমস্যা, স্থূলতা ও অতিচঞ্চলতার মতো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনায় প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ, উদ্যান ও নিরাপদ হাঁটার পথ সংরক্ষণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে পরিবারে স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় হাঁটা ও কায়িক শ্রমে আত্মনিয়োগের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। একটি সুস্থ, সবল ও দীর্ঘায়ু জাতি গঠনে কায়িক শ্রম ও সুষম জীবনচর্চার বিকল্প নেই।