নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে দেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক হাবে রূপ দেওয়ার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের পুরোনো নিয়ম ও জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলোর যাত্রী ও কার্গো সেবা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, এভিয়েশন খাতকে এগিয়ে নিতে প্রায় ৪২ বছর ধরে থাকা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতামূলক নিয়ম পরিবর্তন করা হবে। দেশের বিমানবন্দরগুলোকে তিনি ‘দেশের আয়না’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যে অবস্থায় বিমানবন্দরগুলো পাওয়া গেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে এগুলোকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের করে তুলতে হবে।
শনিবার রাজধানীর কুর্মিটোলার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারের দ্য প্রেস্টিজে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। এভিয়েশন খাতের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সরকার দেশের এভিয়েশন খাতকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে কাজ করছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, দেশের বিমানবন্দরগুলো শুধু যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়, এগুলো দেশের প্রবেশদ্বার। ফলে বিমানবন্দরের অবকাঠামো, যাত্রীসেবা ও কার্গো ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে।
৪২ বছরের নিয়মে পরিবর্তন:
এভিয়েশন খাতে দীর্ঘদিনের আইন ও বিধিমালার বিভিন্ন জটিলতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, উড়োজাহাজের কোনো জটিল যন্ত্রাংশে সমস্যা হলে তা মেরামতের জন্য অনেক সময় ভারত বা সিঙ্গাপুরে পাঠাতে হয়। এরপর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিয়ম মেনে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
এ ধরনের জটিলতা কমাতে বেসামরিক বিমান চলাচলসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। নতুন বিধিমালা তৈরির সময় এয়ারলাইন্সসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলেন মন্ত্রী।
সম্প্রতি এয়ার এশিয়া পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সেখানে মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে একটি উড়োজাহাজ পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া তিনি দেখেছেন। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম খরচে যাত্রীদের টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থাও দেখেছেন।
বাংলাদেশেও এ ধরনের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কথা জানান তিনি।
এসময় বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি কমানোকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় এভিয়েশন খাতে নানা বিশৃঙ্খলা ছিল। আগে কনভেয়ার বেল্টে ছেঁড়া বেল্ট দেখা যেত এবং যাত্রীদের লাগেজ পেতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। এখন পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে।
বিমানবন্দরের কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীদের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কার্গোর দরজা খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যাত্রীরা নামার সময়ই লাগেজ নামানোর কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
লাগেজ ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে বেল্টে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে লাগেজ পেতে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগছে না বলেও জানান তিনি।
বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে এই বিমানবন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন। তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে এ সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ বা তারও বেশি হতে পারে।
তখন আরও বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজারে আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালুর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান বেসামরিক বিমানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পর্যটন শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), যৌথ উদ্যোগ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে কাজে লাগানো হবে।
যেসব কার্যক্রম সরকার নিজে পরিচালনা করতে পারছে না, সেগুলো বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এভিয়েশন খাত নিয়ে নানা সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বিমানবন্দরে এটি নেই, সেটি নেই, রানওয়ে নেই, তাহলে কেন উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, এ ধরনের প্রশ্নের কিছু বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। তবে এসব সমস্যা বসে সমাধান করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন আমাদের ইতিবাচক ভাবতে হবে। সবকিছুই করা সম্ভব।
আগের সরকারের বাতিল করা কিছু উদ্যোগ নতুন করে চালু করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেগুলো পুনর্বহাল করেছেন। এসব উদ্যোগ বাতিলের কারণে দেশের প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জাপানি কনসোর্টিয়াম-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
এভিয়েশন খাতের বিকাশে উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অল্প কয়েকটি উড়োজাহাজ দিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন বড় এয়ারলাইনস গড়ে উঠেছে। এভিয়েশন খাত নিয়ে অযথা টানাপোড়েন না করে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউএস-বাংলার প্রশংসা করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ এনেছে এবং সামনে আরও উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা থাকতে পারে। পাশাপাশি দেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকেও আরও শক্তিশালী করার কথা জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী চান পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাত একটি উচ্চতর মাত্রায় উঠুক।”
আগামী নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাজেট এয়ারক্রাফট নিয়ে আলোচনা হবে বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, কার্গো সুবিধা, আইন ও বিধিমালা সংস্কার, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণ- এসব বিষয়কে সামনে রেখে দেশের এভিয়েশন খাতকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন মন্ত্রী। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।