রাজধানীর খালগুলো পরিষ্কারে মাঝেমধ্যেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ এগিয়ে আসে। নিজেদের শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করে তারা খাল থেকে টনে টনে বর্জ্য অপসারণ করেন। এতে সাময়িকভাবে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়, দুর্গন্ধ কমে এবং ময়লার স্তূপ দূর হয়। কিন্তু কয়েক দিন বা সপ্তাহ যেতে না যেতেই সেই খাল আবার প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও গৃহস্থালি বর্জ্যে ভরে ওঠে। একদিকে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে- পরিষ্কার করা খালগুলো পরিচ্ছন্ন রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা হচ্ছে না কেন?
স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তারা নাগরিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দিচ্ছেন, নগরের পরিবেশ রক্ষায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন। কিন্তু খাল পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ তাদের নিয়মিত দায়িত্ব নয়। এটি নগর কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্বের অংশ। জনগণের করের অর্থে পরিচালিত দুই সিটি করপোরেশনের খাল, ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয় জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য। এরপরও খালগুলো যদি বারবার আবর্জনায় পূর্ণ হয়, তবে অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
খাল পরিষ্কারের পর আবার ময়লা জমার প্রধান কারণ বর্জ্য ফেলার উৎস বন্ধ না হওয়া। খালের পাশে বসবাসকারী মানুষ, দোকানপাট, বাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হচ্ছে। কোথাও পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নেই, কোথাও নিয়মিত সংগ্রহ হলেও নজরদারির অভাবে মানুষ খালকে সহজ বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে একদিকে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে, অন্যদিকে দূষণের প্রবাহও অব্যাহত থাকছে। এই দ্বিমুখী ব্যবস্থাপনায় কোনো স্থায়ী সুফল আসতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, শুধু বছরে একবার খাল পরিষ্কার করলে হবে না। প্রতিটি খালের জন্য পৃথক রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোন খাল কতদিন পরপর পরিষ্কার হবে, কোথায় কতজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন, সংগৃহীত বর্জ্য কোথায় নেওয়া হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কীভাবে কাজ তদারক করবেন- এসব বিষয় সুনির্দিষ্ট করতে হবে। পরিচ্ছন্নতার কাজকে কোনো বিশেষ দিবস, প্রচারাভিযান বা ছবি তোলার আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি হতে হবে নিয়মিত নগর ব্যবস্থাপনার অংশ।
একই সঙ্গে খাল দূষণের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে। খালের পাড়ে বর্জ্য ফেলার সুযোগ বন্ধ করা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা এবং সংশ্লিষ্ট বাসাবাড়ি, দোকান ও প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, সিসিটিভি ও নিয়মিত নজরদারি চালু করা যেতে পারে। খালে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ- এমন ঘোষণা থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর জরিমানাসহ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে শাস্তির পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য ও নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। খাল রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে নিয়ে এলাকাভিত্তিক খাল রক্ষা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি খালে ময়লা ফেলার প্রবণতা, দখল ও দূষণের উৎস সম্পর্কে নগর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে। এতে নাগরিক সচেতনতা বাড়বে এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিও তৈরি হবে। তবে এই অংশগ্রহণ যেন সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
খাল পরিষ্কারের বরাদ্দ অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। কোন খাল কতবার পরিষ্কার করা হয়েছে, কত টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং পরিষ্কারের পর কতদিন খালটি পরিচ্ছন্ন ছিল- এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। কাজের মান যাচাই, স্বাধীন তদারকি এবং নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকলে অনিয়ম কমবে। একই খালে বারবার অর্থ ব্যয় করেও যদি স্থায়ী ফল না আসে, তবে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করতে হবে।
রাজধানীর খাল শুধু ময়লা অপসারণের স্থান নয়; এগুলো নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাল দখল, পয়োবর্জ্য প্রবেশ, প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতা, পরিবেশদূষণ ও জনদুর্ভোগ বাড়তেই থাকবে। তাই খাল রক্ষায় স্বল্পমেয়াদি অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হোক, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হোক, প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। কিন্তু খাল পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। একদিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ ও স্বচ্ছ অর্থব্যয়ের সমন্বয়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে পরিষ্কার করা খাল আবার আবর্জনায় ভরে যাওয়ার সুযোগ না থাকে।