নিজস্ব প্রতিবেদক : সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী বাতিল অথবা সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটি বলছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কর্তৃপক্ষের কাছে ‘অযাচাইকৃত’ বা ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের কাজ বন্ধ এবং সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার নির্বাচিত কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে এক পরামর্শ সভায় প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো নিয়ে আলোচনা করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। অনলাইনে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করতে নতুন ফৌজদারি অপরাধের বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ১০ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের নির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গে এক পরামর্শ সভায় সংশোধিত আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা করেছে। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো অনলাইন বিষয়বস্তুকে কর্তৃপক্ষ যদি ‘অপ্রমাণিত’ বা ‘যাচাইবিহীন’ বলে মনে করে এবং সেটি জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তাহলে তা আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান থাকতে পারে। প্রস্তাবিত আইনের আওতায় মামলাগুলোর বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ও সাইবার আইনের অধীনে বিভিন্ন মামলার বিচার এই বিশেষায়িত আদালতে হয়ে থাকে। শুধু ব্যক্তিই নয়, কোনো সংবাদমাধ্যমও আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী হলে শাস্তির আওতায় আসতে পারে।
আদালত সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতাও পেতে পারে।
বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার বলেন, ‘প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো ব্যাপক। এর ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত।
এমনকি কোনো তথ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত না হলেও, তা যদি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে পাওয়া এবং যাচাই করা হয়, তাহলে সাংবাদিকদের সেটি প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা দরকার।’
কুনাল মজুমদার আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা আইনের ব্যাপক সংশোধনীগুলো এতটাই বিস্তৃত যে, তা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। সাংবাদিকদের অবশ্যই স্বাধীনভাবে উৎস থেকে প্রাপ্ত ও তথ্য-যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ করার স্বাধীনতা থাকতে হবে, যার মধ্যে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনহীন তথ্যও অন্তর্ভুক্ত। সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করতে সাইবার অপরাধ আইনের অপব্যবহারের একটি ইতিহাস বাংলাদেশে রয়েছে এবং ভুল তথ্য দমনের আড়ালে বর্তমান সরকারের সেই ধারার পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়।’
অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান বলেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা রোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার লক্ষ্যেই সংশোধনীগুলোর খসড়া আনা হয়েছে।’
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনের ব্যবহার নিয়ে আগেও বিতর্ক হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ডিজিটাল সুরক্ষা আইনের অধীনে অনলাইন বাকস্বাধীনতা ও ডিজিটাল অপরাধসংক্রান্ত মামলায় অন্তত ২৫৫ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়।
এই আইনে করা একটি মামলায় লেখক মোশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচার শুরু হওয়ার আগেই প্রায় নয় মাস কারাগারে থাকার পর ২০২১ সালে তিনি মারা যান। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছে ই-মেইলে জানতে চেয়েছিল সিপিজে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক জবাব পাওয়া যায়নি।