বিনোদন প্রতিবেদক : ফ্রান্সের চলচ্চিত্র জগতের আইকন ব্রিজিত বারদো রোববার মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তার প্রতিষ্ঠিত ব্রিজিত বারদো ফাউন্ডেশন বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ফরাসি রিভিয়েরার সাঁ-ত্রোপে নিজের বাসভবন ‘লা মাদ্রাগ’-এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ফ্রান্সের সাঁ-ত্রোপে থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
এএফপিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে ফাউন্ডেশন জানায়, ‘গভীর শোকের সঙ্গে ব্রিজিত বারদো ফাউন্ডেশন তার প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রী ও গায়িকা ম্যাডাম ব্রিজিত বারদোর মৃত্যুর সংবাদ জানাচ্ছে। তিনি নিজের গৌরবময় ক্যারিয়ার ত্যাগ করে প্রাণিকল্যাণে জীবন ও শক্তি উৎসর্গ করেছিলেন।’
মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি। তবে গত অক্টোবরে ‘সামান্য’ একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়ার জন্য তাকে স্বল্প সময়ের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বলে তার দপ্তর জানিয়েছিল। সে সময় ইন্টারনেটে তার মৃত্যুর গুজব ছড়ালে তিনি তা নিয়ে সমালোচনাও করেছিলেন।
দেশে ‘বিবি’ নামে পরিচিত এই তারকার মৃত্যুতে তাৎক্ষণিকভাবেই শ্রদ্ধা জানানো শুরু হয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তাকে বিংশ শতাব্দীর এক ‘কিংবদন্তি’ বলে আখ্যা দেন।
এএফপির এক প্রতিবেদক জানান, তার সাঁ-ত্রোপের বাড়িতে একটি শববাহী গাড়ি প্রবেশ ও বের হতে দেখা যায়। এ সময় কয়েকজন ভক্ত পুলিশের গাড়ির কাছে ফুল রেখে যান।
অল্প কয়েকজনে লোক বারদোর নীল রঙের ফটক পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন ৩৬ বছর বয়সী জুলিয়া গ্যাংগোতেনা তাদের একজন। সেখানে ক্রিসমাসের মালা ও পানিভর্তি কুকুরের বাটির পাশে তিনি একটি সাদা গোলাপ রেখে আসেন। তিনি এএফপিকে ছবি দেখিয়ে এ কথা জানান।
একটি সচ্ছল ও ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক পরিবারে ১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন ব্রিজিত বারদো।
চারবার বিয়ে করেন তিনি। দ্বিতীয় স্বামী, অভিনেতা জাক শারিয়েরের সঙ্গে তার একমাত্র সন্তান নিকোলা-জাক শারিয়েরের জন্ম হয়।
১৯৫৬ সালে ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর প্রায় ৫০টি ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৭৩ সালে অভিনয় জীবন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।
খ্যাতির জীবন ছেড়ে তিনি পরিত্যক্ত প্রাণীদের দেখভালে মনোনিবেশ করেন। একসময় তিনি বলেছিলেন, প্রতিদিন সুন্দর হয়ে থাকার চাপ তাকে ক্লান্ত করে তুলেছিল।
মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘ব্রিজিত বারদো স্বাধীন জীবনের প্রতীক।’
তবে চলচ্চিত্র জীবন শেষে তার কট্টর ডানপন্থী অবস্থানের কথা ওই শ্রদ্ধাবার্তায় উল্লেখ করা হয়নি, যা বহু ভক্তকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক মারিন ল্য পেনের সমর্থক বারদো ২০০৩ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে নিজেকে ‘ফ্রান্সের ইসলামায়নের বিরুদ্ধে’ ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আগ্রাসনকারীদের ঠেকাতে জীবন উৎসর্গ করেছেন।’
ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা জর্দান বারদেলা তাকে একজন ‘উদ্দীপ্ত দেশপ্রেমিক’ বলে অভিহিত করেন।
চলচ্চিত্র থেকে অবসর নেওয়ার পর সাঁ-ত্রোপের বাড়িতে নিজেকে গুটিয়ে নেন বারদো। সেখান থেকেই প্রাণীর অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নিজেকে উৎসর্গ করেন।
তার শেষ চলচ্চিত্র ‘দ্য এডিফাইং অ্যান্ড জয়াস স্টোরি অব কলিনোত’-এর শুটিং সেটে একটি ছাগল দেখার পরই তার জীবনে এই মোড় আসে। প্রাণীটিকে জবাই থেকে বাঁচাতে তিনি সেটি কিনে নিজের হোটেল কক্ষে রাখেন।
১৯৮৬ সালে তিনি ব্রিজিত বারদো ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। সংস্থাটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে এর ৭০ হাজার দাতা ও প্রায় ৩০০ কর্মী রয়েছে।
২০২৪ সালে ৯০তম জন্মদিনের আগে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘জীবনের প্রথম অধ্যায় নিয়ে আমি খুব গর্বিত। সেটিই আমাকে খ্যাতি দিয়েছে। আর সেই খ্যাতিই আমাকে প্রাণীদের রক্ষা করতে সাহায্য করেছে যেটিই আমার কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কারণ।’
তিনি বলেন, লা মাদ্রাগে তিনি প্রকৃতির মাঝে ‘নীরব নিঃসঙ্গতায় বাস করতেন এবং মানব সমাজ থেকে দূরে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ‘একদল নির্বোধের ভিড়’ তিনি চান না।