শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

আলুর দরে ধস, চাঁদপুরে চাষি-হিমাগার বিপাকে

চাঁদপুর প্রতিনিধি : চাঁদপুরে আলুর বাজারদরে ধস নামায় চাষি ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ চরম বেকায়দায় পড়েছেন। হিমাগারে রাখা আলু তারা যেমন তুলতে পারছেন না, তেমনি গত মৌসুমে বাকিতে কেনা আলুবীজের ধারদেনাও মেটাতে পারছেন না। এতে হিমাগার কর্তৃপক্ষও বিপাকে পড়েছে।

জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে আলুচাষির সংখ্যা ৫৬ হাজার ৮৬০ জন। সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় সদর, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়া উপজেলায়। এসব উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক হাটবাজারে পুরোনো আলু এখনো মাত্র ৭–৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামীণ বাজারে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় শাকসবজির দামও কমেছে। শিম, বরবটি, করলা ও গাজর বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে, টমেটো ৪০ টাকা কেজিতে—যা ১৫–২০ দিন আগেও ছিল ৯০ থেকে ১২০ টাকা।

আলুর দাম কমে যাওয়ায় বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ে অনেক চাষি আলু চাষে বিমুখ হয়েছেন। তবে নতুন মৌসুমে আবারও অনেককে আলু বপনে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। সদর, কচুয়া ও মতলব দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ মোবারক হোসেন বলেন, এবার বাজারে কোনো সিন্ডিকেট না থাকায় দাম কমই থাকবে। তার ভাষায়, “গত মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে ক্রেতাদের ৮০ টাকা কেজিতে আলু কিনতে হয়েছে। এবার সে পরিস্থিতি নেই।”

কচুয়া উপজেলায় হিমাগারে রাখা আলু নিয়ে চাষি ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ মারাত্মক সংকটে পড়েছে। উপজেলার তিনটি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু মজুত আছে। বাজারদর কমে যাওয়ায় চাষিরা আলু ফেরত নিচ্ছেন না। ফলে হিমাগারের ভাড়া আদায় করতে পারছেন না কর্মচারীরা।

হিমাগার ব্যবস্থাপক মঙ্গল খান ও ইয়াছিন মিয়া জানান, চাষিরা আলু না তুললে বা ফেরত না নিলে সেগুলো বিক্রি করেও ভাড়ার টাকা আদায় সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বাজারে আলুর দাম অত্যন্ত কম।

গত মৌসুমে জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। বর্তমানে ভালো মানের পুরোনো আলু ৮–১০ টাকা কেজি এবং নতুন আলু ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

হাজীগঞ্জের বাকিলা বাজারের প্রবীণ চাষি বাচ্চু মিজি বলেন, “আমার জমিতে ১০০ মণ আলু হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, পুরোটাই লস।” তিনি ও অন্যান্য চাষি জানান, সামনে তারা আর আলু চাষ করতে চান না।

সদরের শাহ মাহমুদপুর এলাকার চাষি বাবুল, মকবুল, জহুরুল হক, হানিফ পাটোয়ারি ও তার ছেলেরাও একই হতাশার কথা জানান। হানিফ পাটোয়ারি বলেন, “গত মৌসুমের আলুবীজের টাকাই এখনো দিতে পারিনি। যে লস খেয়েছি, সামনে আর আলু চাষ করব না।” তিনি জানান, বাবুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর হিমাগারে রাখা তার ৩৩ বস্তা আলু বস্তাপ্রতি মাত্র ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।

কচুয়া উপজেলায়ও চাষিরা লাভের আশায় আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুতে আলু ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও এখনো অর্ধেকের বেশি আলু হিমাগারে পড়ে আছে। এতে হিমাগার কর্তৃপক্ষের হতাশাও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সদর, হাইমচর, কচুয়া, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলায় অধিকাংশ মাঠে আলু রোপণ ও বপনের কাজ চলছে। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিক নিয়ে আলু রোপণে ব্যস্ত চাষিরা।

সদরের বাগাদীর শামসুল ইসলাম, ধনপর্দির ইসমাইল হোসেন ও সুরুজ মিয়া জানান, গত বছর তারা আলুর ন্যায্য দাম পাননি। তাই এবার কম জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের আশা করছেন, তবে ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে সন্দিহান।

সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ থেকে নৌপথে নতুন আলু আসতে শুরু করেছে। তবে দাম ৭০ টাকা থেকে নেমে ২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে। বর্তমানে ৫ কেজি নতুন আলু ১০০ টাকায় এবং ১০ কেজি পুরোনো আলু ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কৃষিবিদ মোবারক হোসেন জানান, জেলায় বর্তমানে ১০টি হিমাগার চালু রয়েছে। এতে মোট ৮০ হাজার ১৬৯ টন আলু সংরক্ষিত আছে। সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার ২৫০ টন। তার মতে, যদি সিন্ডিকেট থাকত, তাহলে বাজারে আলুর দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে উঠত।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু তাহের বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর, যা গতবারের তুলনায় ১ হাজার হেক্টর কম। কারণ চাষিরা প্রকৃত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং আগের দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না। তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। দাম ভালো পেলে চাষিরা আবারও আগ্রহী হবেন।