বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারাবন্দি হওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান। লন্ডনে অবস্থান করে তিনি ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করে আসছিলেন। সম্প্রতি মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। তবে দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পরই গত ৩০ ডিসেম্বর মাকে হারান তিনি। মায়ের মৃত্যুর পর এখন দলের পূর্ণ দায়িত্বই তারেক রহমানের কাঁধে। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় বিজয় নিশ্চিত করতেও তাকে রাখতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সরকারের ভূমিকা কেমন হবে, তা-ও নির্ধারণ করতে হবে তাকে।
তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, মা বেগম খালেদা জিয়াকে হারিয়ে গভীর শোকার্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিচ্ছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করে চব্বিশোত্তর নতুন বাংলাদেশ গড়তে চান তিনি। তার ভাবনায় এখন দল ও দেশ দুটিই। ব্যক্তিগত শূন্যতাকে তিনি দেশসেবার শক্তিতে রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর। সেই লক্ষ্যেই নানামুখী কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। মায়ের আদর্শকে ধারণ করে তিনি এখন এক নতুন যাত্রার দ্বারপ্রান্তে। শোকের মেঘ কাটিয়ে তিনি যে সূর্যের প্রত্যাশা করছেন, তা হলো একটি সমৃদ্ধ ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ। দলের কর্মী ও সাধারণ মানুষ তার নির্দেশনায় একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখছেন। এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছেন তিনি। এর অংশ হিসেবে গতকাল নিজের একান্ত সচিব ও প্রেস সচিব নিযুক্ত করেছেন।
ঘনিষ্ঠজনদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তারেক রহমানের জন্য কেবল অভিভাবক হারানো নয়, বরং একটি রাজনৈতিক যুগের অবসান। তবে পরিবার থেকে পাওয়া শোককে শক্তিতে রূপান্তরের দীক্ষা তাকে দ্রুত কর্মতৎপর করে তুলেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের হাল ধরা এবং গণতান্ত্রিক ধারা পুনরুদ্ধারে তিনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও কৌশলী। তার বর্তমান ধ্যানজ্ঞানজুড়ে রয়েছে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং আধুনিক বাংলাদেশ। তার ভাবনায় নতুন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হলো জনগণের শাসন। তার রাজনৈতিক চিন্তার প্রধান দিকগুলো হলো—রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার, সুশাসন ও মানবাধিকার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। অর্থাৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তি দেওয়া।
আগামী মঙ্গলবার কয়েকদিনের জন্য সড়কপথে উত্তরবঙ্গ সফরে যেতে পারেন তারেক রহমান। সফরের প্রথমে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করার কথা জানা গেছে। আগামীকাল সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তার সফর এবং পূর্ণ চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাত দিনের দলীয় শোক কর্মসূচি চলছে, যা মঙ্গলবার পর্যন্ত থাকবে। এই মুহূর্তে ঢাকার বাইরে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। তবে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের কবর জিয়ারত করবেন বলে জানা গেছে।
বিএনপির মনোযোগের কেন্দ্রে এখন ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন পরিচালনায় ৪১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে তারা পুরোপুরি নির্বাচনমুখী হতে চান। দলীয় প্রধানের মৃত্যুতে ঘোষিত সাত দিনের শোক কর্মসূচি ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে পূর্ণোদ্যমে ভোটের মাঠে সক্রিয় হবেন ধানের শীষের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, প্রতীক বরাদ্দ এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে নজর রাখছে বিএনপি হাইকমান্ড। একই সঙ্গে প্রচার-প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ এবং দলীয় ইশতেহার চূড়ান্তকরণের কাজও এগিয়ে চলছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের ভালোবাসা বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করবে। তার চলে যাওয়ায় দেশবাসী গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে মানুষ তার জানাজায় সমবেত হয়েছেন। আগামীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা দেশনেত্রীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চাই। শোক কর্মসূচি শেষে সাংগঠনিক কাজে পূর্ণোদ্যমে মনোনিবেশ করব। নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি কমিটি হয়েছে, শিগগিরই করণীয় ঠিক করা হবে।
কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, তারেক রহমানের নতুন ভাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় ঐক্য। তিনি মনে করেন, বিভাজনের রাজনীতি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাই সব মত ও পথের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনই তার মূল লক্ষ্য। মায়ের অভাব পূরণ হওয়ার নয়; কিন্তু দেশের মানুষের ভালোবাসা ও তাদের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বই এখন তার জীবনের প্রধান ব্রত। তার লক্ষ্য—এমন এক বাংলাদেশ গড়া যেখানে ন্যায়বিচার হবে শেষ কথা।
বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু বলেন, বর্তমানে তারেক রহমানের কাছে দল এবং দেশ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দলই পারে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র উপহার দিতে। নিশ্চয়ই তিনি দলকে এমনভাবে গড়ে তুলবেন যাতে তৃণমূলের ভূমিকা প্রাধান্য পায়। একই সঙ্গে চব্বিশের ঐতিহাসিক বিপ্লবে তরুণদের ভূমিকার প্রতি সম্মান জানিয়ে আগামীর নেতৃত্বে মেধাবী ও সৎ তরুণদের অগ্রাধিকার দেবেন।