মুক্তবাণী ডেস্ক : ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ারের কারণে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ১৪ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দক্ষিণ টিয়াখালী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত জাহান সোনিয়াকে। চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় তাঁকে ৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন সংগ্রাম করতে হয়েছে।
নুসরাতের সেই পেটের শিশুর বয়স এখন সাত বছর পেরিয়েছে। সন্তান এখন মায়ের কাছে জানতে চায়—তাকে পেটের ভেতর রেখে কেন মাকে জেল খাটতে হয়েছিল।
ফেসবুক পোস্টে শুরু হয় কষ্ট
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। সে সময় ৩ আগস্ট অন্যের একটি পোস্ট ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন নুসরাত। এর জেরে ৪ আগস্ট মধ্যরাতে তাঁকে আটক করে কলাপাড়া থানায় নেওয়া হয়। পরদিন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারায় মামলা হয়। ৬ আগস্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহীদুল ইসলামের সই করা চিঠির মাধ্যমে তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন পর নুসরাত মামলা থেকে অব্যাহতি পান। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার উম্মে সাহারা লাইজুর সই করা চিঠির মাধ্যমে তাঁর বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার হয়। ওই সময়ের চাকরিকাল গণ্য হবে এবং বকেয়া বেতনভাতা পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়। ২৯ ডিসেম্বর তিনি কাজে যোগ দেন।
অমানবিক অভিজ্ঞতা
নুসরাত বলেন, “পেটে সাত মাসের সন্তান নিয়ে থানায় আমাকে ১২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল। কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। হাত-পা ফুলে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, আমি ভয়ংকর কোনো অপরাধী।”
তিনি জানান, কারাগারে পাতলা কম্বল পেতে ঘুমাতে হতো। বড় পেট নিয়ে একা উঠতে পারতেন না। খাবারও ছিল অস্বাস্থ্যকর। জামিনের বিরোধিতা করেছিল রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
দীর্ঘ সংগ্রাম
গ্রেপ্তারের সময় বড় ছেলের বয়স ছিল ৬ বছর, এখন ১৩ বছরের বেশি। জেল থেকে বের হওয়ার পর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। নুসরাত বলেন, “অপরাধীর মতো জীবন কাটাতে হয়েছে। এলাকার অনেকে ভয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতেন না। আমি যে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব তা ভাবতেও পারিনি।”
প্রতারকের খপ্পর
কারাগারে থাকার সময় তাঁর বাবার কাছে প্রতারক ফোন করে চিকিৎসকের পরিচয়ে টাকা দাবি করেছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
আইনি লড়াই
মামলার শুরু থেকে পরিবার পাশে ছিল। বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দিয়েছিল ব্লাস্ট। মামলাটি প্রথমে ঢাকা, পরে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। হাইকোর্ট গত বছরের ২২ মে মামলার কার্যক্রম বাতিল করে তাঁকে অব্যাহতি দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ২০১৯ সালে চার্জশিট দেওয়ার সময় আইনের অপব্যবহার হয়েছে।
ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, “নুসরাতের সঙ্গে যা ঘটেছে তা অন্যায়। রাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং দোষীদের ক্ষমা চাইতে হবে।”
নুসরাত বলেন, “এই দীর্ঘ সময় অন্ধকারে কাটিয়েছি। আমার কোনো স্বাভাবিক জীবন ছিল না। এখন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছি।”