নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বতন্ত্র প্রার্থী বা ‘বিদ্রোহী’ নেতাদের বিষয়ে আপাতত দুই কৌশলে এগোচ্ছে বিএনপি—প্রথমে বোঝানো, কাজ না হলে বহিষ্কার। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া এসব প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহারে রাজি করাতে অঞ্চলভিত্তিক জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সরাসরি যোগাযোগ করে দলীয় সিদ্ধান্তের গুরুত্ব তুলে ধরছেন এবং অমান্য করলে সম্ভাব্য সাংগঠনিক পরিণতির কথা জানাচ্ছেন। এ উদ্যোগে ইতিমধ্যে কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে। চাপ প্রয়োগ নয়, বরং দলীয় ঐক্য ও নির্বাচনী কৌশলের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। প্রয়োজনে শেষ পর্যায়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারেন। তবে শীর্ষ পর্যায় থেকে এটিকে বিদ্রোহীদের জন্য ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরপরও মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার অভিযোগে ৯ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “প্রতিনিয়ত তাঁদের বোঝানো হচ্ছে। এরপরও না বুঝলে তাঁদের বিরুদ্ধে তো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতেই হবে। এ ছাড়া আর উপায় কী।”
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সরে দাঁড়ালে তাঁদের সাধুবাদ জানানো হবে। তবে সময়সীমা পার হলে অবাধ্য নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিএনপির সিদ্ধান্ত, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। কোনো আসনে বিদ্রোহী থাকলেও নেতা-কর্মীরা দল মনোনীত প্রার্থী ছাড়া অন্য কারও পক্ষে কাজ করতে পারবেন না। নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ইউনিট বা কমিটিও দায়ী হবে।
প্রথম আলোর হিসাবে দেখা গেছে, সারা দেশের ১১৭টি আসনে বিএনপির ১১৯ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোথাও দীর্ঘদিনের পুরোনো নেতা বাদ পড়ায় ক্ষোভ, কোথাও স্থানীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব—এটাই বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার বড় কারণ।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে ১৬টি আসনে সমঝোতা করেছে বিএনপি। এতে শরিক দলগুলো প্রাথমিকভাবে স্বস্তি পেলেও নির্বাচনী মাঠে বাস্তবতা ভিন্ন। বিএনপি যেসব আসন ছেড়ে দিয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা পাচ্ছেন না শরিক দলের প্রার্থীরা। বরং বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয়তায় জোট প্রার্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে শরিক দলের নেতারা সরাসরি বিএনপির চেয়ারম্যান ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির হস্তক্ষেপ চাইছেন। তাঁদের দাবি, তৃণমূলে কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকাশ্য নির্দেশনা জরুরি।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, নড়াইল-২ আসনে এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, যশোর-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাছ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খাঁন, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সৈয়দ এহসানুল হুদা এবং কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির রেদওয়ান আহমেদকে ছেড়ে দিয়েছে।
এঁদের মধ্যে ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খাঁন, শাহাদাত হোসেন সেলিম, এহসানুল হুদা, রেদওয়ান আহমেদ ও ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এ ছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এসব আসনে তারা দলীয় প্রতীকে (খেজুরগাছ) নির্বাচন করছেন।
মিত্র দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, আসন ছাড় দেওয়া হলেও তৃণমূল বিএনপিকে কঠোর নির্দেশনা না দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও তা প্রত্যাশার তুলনায় কম। তাই তাঁদের মতে, কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর নির্দেশনা ছাড়া পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হবে।