শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১১ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

যমুনায় নতুন সড়কসেতু: সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পরামর্শক নিয়োগ শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক : যমুনা নদীর ওপর বর্তমানে চার লেনের একটি সেতু চালু রয়েছে, যা দেশের উত্তর-দক্ষিণ সংযোগের প্রধান করিডর। এ ছাড়া রেল যোগাযোগের জন্য আলাদা রেলসেতু নির্মিত হয়েছে। তবু ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ বিবেচনায় এবার নদীটিতে আরেকটি সড়কসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। নির্মাণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালাতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন সেতু নির্মাণে নদীর স্বাভাবিক চরিত্র বজায় রাখা জরুরি। নৌপথ ও পরিবেশের ওপর যেন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান যমুনা সেতুর ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উজান বা ভাটিতে নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সমীক্ষার পরই চূড়ান্তভাবে স্থান নির্ধারণ হবে। বর্তমান সেতুর খুব কাছাকাছি নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেই। নতুন সেতুর মাধ্যমে উত্তর-দক্ষিণ স্থল যোগাযোগে বিকল্প করিডর তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সেতুর সম্ভাব্য ব্যয়, নকশা এবং যৌক্তিকতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়ে বলেন, ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া যমুনা সেতু চার লেনের হলেও যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়েছে। আগামী ১০ বছরে এর ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে যাবে। দুপাশের মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত হলেও সেতুটি তুলনামূলকভাবে সরু। পাশাপাশি দুটি বড় যানবাহন চলতে সমস্যা হয়।

সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা আরও জানান, যমুনার মতো বড় নদীতে সেতু নির্মাণে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। তাই আগাম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, “দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার স্বার্থেই যমুনা নদীর ওপর নতুন একটি সড়কসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।”

সমীক্ষার জন্য দেশি-বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগ্রহপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ইওআই জমা দিয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি প্রাথমিকভাবে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করেছে। তারা বিশদ প্রস্তাব জমা দেবে, এর ভিত্তিতে একটি প্রতিষ্ঠানকে সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
সেতু নির্মাণে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ হয়। প্রথম যমুনা সেতু নির্মাণের পর যোগাযোগে বিপ্লব হলেও চর জেগে ওঠা ও নদীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। গত বছর প্রথম সেতুর ৩০০ মিটার উত্তরে রেলসেতু নির্মিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন সড়কসেতুর উদ্যোগে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, “সমীক্ষা অবশ্যই নির্ভরযোগ্যভাবে চালাতে হবে। কোনো গোপনীয়তা রাখা যাবে না। চর সৃষ্টি বা নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে কি না, তা বিস্তারিত যাচাই করতে হবে। স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে।”

বুয়েট অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, “একই করিডরে তিনটি সেতু হলে দীর্ঘ মেয়াদে নাব্যতা ও নদী ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই নতুন সেতু ভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা জরুরি।”

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “উত্তরবঙ্গের গেটওয়েকে বিস্তৃত করা জরুরি। তবে নতুন সেতুটি যমুনা সেতুর কাছাকাছি নয়, ভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা উচিত।”