নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন করেছেন ২৩ জন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন, কানাডার দুজন এবং তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া ও ফিনল্যান্ড থেকে একজন করে নাগরিকত্ব ছেড়ে প্রার্থী হয়েছেন।
১৮ জানুয়ারি আপিল শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এসব প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে ভোটের মাঠে লড়াইয়ের সুযোগ দিয়েছে। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা তিনজন প্রার্থী ভোটের প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছেন।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি মনোনীত ১০ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন, জাতীয় পার্টির ২ জন, খেলাফত মজলিসের ১ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১ জন এবং ২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
ইসি জানিয়েছে, দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে কমিশন অবস্থান শিথিল করেছে। অধিকাংশ প্রার্থী গত ডিসেম্বরে নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন করেছেন। যাঁরা পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, ফি পরিশোধ করেছেন এবং নাগরিকত্ব ছাড়ার প্রমাণ দিয়েছেন, তাঁদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেকের কাছ থেকে হলফনামাও নেওয়া হয়েছে। তবে আবেদন করলেই সব দেশের নাগরিকত্ব বাতিল হয় না; দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন বিধান রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেছেন, ইসির ব্যাখ্যার অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আবেদন করেই কেউ নির্বাচনে অংশ নিলেও পরবর্তীতে আবেদন প্রত্যাহার বা বাতিল হলে আইনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, শপথের দিন যদি অন্য দেশের পাসপোর্ট থেকেই যায়, তবে তিনি দ্বৈত নাগরিক হিসেবেই গণ্য হবেন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আবেদন গ্রহণের প্রমাণ ও প্রক্রিয়া পূরণের প্রমাণ যাঁরা দিয়েছেন, তাঁদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি মনে করেন, আপিল শুনানিতে কমিশন যথাযথভাবে বিবেচনা করেছে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারাতে হয়। তবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করলে এবং পরে তা ত্যাগ করলে তিনি বিদেশি নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন না।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে আপিল শুনানিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেকে জীবন বাঁচাতে অন্য দেশের নাগরিক হয়েছেন। আমরা যদি পুরোনো ধ্যান-ধারণায় থাকি, তাহলে এগোতে পারব না। গণবিপ্লবের স্পিরিট ধারণ করে এগোতে হবে।’
কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি উল্লেখ না করলেও লিখিতভাবে কমিশনকে জানিয়েছেন। কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়া হলফনামায় বিষয়টি উল্লেখ না করায় তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, যাঁরা নাগরিকত্ব ত্যাগ করে হলফনামায় সত্য বলেছেন, তাঁদের মনোনয়ন বৈধ হওয়া সঠিক। আর যাঁরা উল্লেখ করেননি, তাঁদের মনোনয়ন অবৈধ।
যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছাড়াদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় পার্টির মো. মঞ্জুম আলী, খেলাফত মজলিসের মো. আজাবুল হক, জামায়াতের মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ ও মো. মাহবুবুল আলম, এনসিপির এহতেশামুল হক, জামায়াতের মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, বিএনপির এ কে এম কামরুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান, তাহির রায়হান চৌধুরী, মো. শওকতুল ইসলাম, আবদুল আউয়াল মিন্টু, আফরোজা খানম, স্বতন্ত্র মো. আনোয়ার হোসেন ও শেখ সুজাত মিয়া এবং ইসলামী আন্দোলনের জহিরুল ইসলাম।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছাড়াদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির শামা ওবায়েদ ইসলাম, জামায়াতের এ কে এম ফজলুল হক এবং ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন। কানাডার নাগরিকত্ব ছাড়াদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের মো. জোনায়েদ হাসান ও বিএনপির মুশফিকুর রহমান। তুরস্কের নাগরিকত্ব ছাড়েন বিএনপির কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ছাড়েন বিএনপির মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী এবং ফিনল্যান্ডের নাগরিকত্ব ছাড়েন জাতীয় পার্টির মু. খুরশিদ আলম।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপির মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়া ও ময়মনসিংহ-৬ আসনের স্বতন্ত্র তানভীর আহমেদ রানা এবং জার্মানির নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আজিজুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।