বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১৬ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

গাদ্দাফির পুত্র সাইফ : জিনতানে রহস্যময় হত্যাকাণ্ড

সাইফ আল–ইসলাম গাদ্দাফি

মুক্তবাণী ডেস্ক : লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে আলোচিত ছেলে সাইফ আল–ইসলাম গাদ্দাফি দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে নিহত হয়েছেন। নিহত হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ৫৩ বছর। তিনি গাদ্দাফির দ্বিতীয় ছেলে। ২০১১ সাল থেকে তিনি জিনতানেই অবস্থান করছিলেন—প্রথমে কারাগারে, পরে ২০১৭ সাল থেকে মুক্ত অবস্থায়। এ সময় তিনি রাজনীতিতে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন।

সাইফ আল–ইসলামের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান এবং আইনজীবী খালেদ এল–জাইদি মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁর রাজনৈতিক দলের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চার মুখোশধারী ব্যক্তি জিনতানে সাইফের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে হত্যা করে। এটিকে ‘গুপ্তহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া জানিয়েছে, চারজন হামলাকারী সাইফ আল–ইসলামের বাসভবনে প্রবেশ করে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। রাজধানী ত্রিপোলির দক্ষিণ–পশ্চিমে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার দূরে জিনতান শহরে এই ঘটনা ঘটে। গাদ্দাফি পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসভবনের বাগানে তাঁকে গুলি করা হয়। এরপর হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

আরও জানা গেছে, বন্দুকধারীরা প্রথমে বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা অকার্যকর করে দেয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে তাঁকে গুলি করা হয়। স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে তিনি নিহত হন। সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা ঘটনাটিকে সরাসরি ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সাইফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, “আমরা আল্লাহর এবং আল্লাহর কাছেই আমরা ফিরে যাব। মুজাহিদ সাইফ আল–ইসলাম গাদ্দাফি এখন আল্লাহর তত্ত্বাবধানে।”

২০১১ সালের গণ–অভ্যুত্থানের আগে সাইফ আল–ইসলাম ছিলেন তাঁর বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি এবং লিবিয়ার দ্বিতীয় সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। আরব বসন্তের বিক্ষোভের পর দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ তাঁকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

২০১১ সালের মার্চে জাতিসংঘ গাদ্দাফির বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমোদন দিলে ন্যাটো লিবিয়ায় বোমাবর্ষণ শুরু করে। ওই বছরের জুনে সাইফ ঘোষণা দেন, তাঁর বাবা নির্বাচন দিতে রাজি। তবে ন্যাটো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। একই বছরের জুনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

২০১১ সালের অক্টোবরে সিরতে শহরে তাঁর বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও ভাই মুতাসসিম নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়। ২০১৪ সালে জিনতানে বন্দী থাকা অবস্থায় ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আদালতে হাজির হন তিনি। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ২০১৭ সালে স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনী তাঁকে মুক্তি দেয়।

এরপর বহু বছর তিনি আড়ালে ছিলেন। ২০২১ সালে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ নির্বাচনকে ভয় পায়। একই বছরের নভেম্বর মাসে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে আবেদন জমা দেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত সাইফ আল–ইসলাম ২০০৮ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পিএইচডি করেন। তাঁর গবেষণাপত্রে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি–সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি অংশ নেন। লকারবি বিমান হামলা, বার্লিন নাইটক্লাব হামলা এবং ইউটিএ ফ্লাইট বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ আলোচনায়ও তিনি ভূমিকা রাখেন।

এ ছাড়া তিনি লিবিয়ায় শিশুদের এইচআইভি সংক্রমণের অভিযোগে অভিযুক্ত ছয় চিকিৎসকের মুক্তি নিশ্চিত করেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ছিলেন বুলগেরিয়ান। আট বছর কারাবন্দী থাকার পর তাঁরা মুক্তি পান।

সাইফ আল–ইসলামের আরও কিছু প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ‘ইসরাতিন’ নামে একটি প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য, যেখানে ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংঘাতের সমাধানে এক রাষ্ট্রভিত্তিক কাঠামোর কথা বলা হয়। তিনি ফিলিপাইনের সরকার ও মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে শান্তি আলোচনারও আয়োজন করেন।

সাইফ আল–ইসলামের মৃত্যু লিবিয়ার অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর হত্যাকাণ্ড দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।