মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২১ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

সরকার গঠন করলে প্রথমদিন ফজর পড়েই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করব: জামায়াত আমির

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মানবিক, বৈষম্যহীন ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দেওয়া এই ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়।

ভাষণে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের মান-ইজ্জত ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষা দেওয়াই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য। আল্লাহর ইচ্ছা ও জনগণের সমর্থনে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে প্রথম দিন থেকেই—ফজরের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে—রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়; এটি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবার দেশ। এখানে কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করবে না। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ আক্রান্ত হলে, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। রাষ্ট্র পরিচালনাকে কোনো ভোগের বিষয় নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেককে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে।

জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই এসেছে কারণ দেশের মানুষ এক হয়েছিল। ছাত্র, শ্রমিক, নারী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক কর্মী এমনকি সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেমিক সদস্যদের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই সে সময় একটি গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আর যেন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়—এমন বাংলাদেশ গড়াই তাদের লক্ষ্য। জুলাইয়ের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।

ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারতন্ত্র ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকার ফলে মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এসব নিপীড়ন থেকেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের জন্ম বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তরুণদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আজকের তরুণ প্রজন্ম একটি “নতুন বাংলাদেশ” বা “বাংলাদেশ ২.০” দেখতে চায়। তারা পরিবর্তনকে গ্রহণ করে, প্রযুক্তি বোঝে এবং সত্য বলতে দ্বিধা করে না। আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, ওসমান হাদীদের মতো তরুণদের সাহসিকতাই এই পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা বলে উল্লেখ করেন তিনি। দেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণদের হাতেই তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিলেও অনেকগুলো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। এ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ এবং দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘না’—এই পাঁচটি মৌলিক অবস্থানের ওপরই তাদের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে। অতীতে জামায়াতের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকার দাবিও করেন তিনি।

নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে সমাজ নারীর সম্মান রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ কখনো উন্নত হতে পারে না। ক্ষমতায় এলে নারীদের সমাজ ও রাষ্ট্রের মূলধারার নেতৃত্বে সম্মানের সঙ্গে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতেও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে, তবে জাতীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের অঙ্গীকার করেন তিনি।

ভাষণের শেষাংশে আগামী নির্বাচনকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান জনগণকে নৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান। সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।