বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৫ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

আমি অসহায়, আমার সঙ্গে আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই : তনুর বাবা

কুমিল্লা (উত্তর) প্রতিনিধি : আমি খুব অসহায়, আমার সঙ্গে এক আল্লাহ ছাড়া কেউ নাই, আমি খুব আশাবাদী আমার মেয়ের হত্যাকারীদের সঠিক বিচার হবে। দীর্ঘ ১১ বছর আমি বিচারের অপেক্ষায় আদালতের বারান্দায় ঘুরেছি, কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার আবেদন, আমার বিচারটা যেন সঠিকভাবে হয়।

বুধবার বিকেল ৫টার দিকে সোহাগী জাহান তনুর বাবা মো. ইয়ার হোসেন আদালতে জবানবন্দি শেষে গণমাধ্যমকে এসব কথা বলেন।
এসময় তনুর মা আনোয়ারা বেগম ও ছোট ভাই রুবেল হোসেন কুমিল্লা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে দীর্ঘ ১০ বছর পর ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন তৎকালীন সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে (অব.) ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকার তার নিজ বাসায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বুধবার বিকালে তাকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হকের আদালতে হাজির করা হলে আদালত শুনানি শেষে হাফিজুরের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, আজকে ১১ বছর আমার মামলার কোনো অগ্রগতি নেই, এ সরকার আসার পর মামলাটি আদালতে উঠেছে।
আমার বিশ্বাস যারা আমার মেয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত তাদের ফাঁসির রায় হবে। পুরো দেশবাসী এই বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে, আমার মেয়েকে মারা হয়েছে ক্যান্টমেন্টের ভেতরে, যেখানে একটি পিঁপড়াও ঢুকতে পারে না এমন এলাকা। দেশের সবাই জানে তাকে কেন মারা হয়েছে। এত বাহিনী থাকতে আমার মেয়েকে কারা মারছে তা বলতে পারেনি।

আসামির পরিচয় সম্পর্কে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, সার্জেন্ট জাহিদ, তার স্ত্রী, জিওসি স্যারের স্ত্রী, কমান্ডার স্যারের স্ত্রী তারা আমার মেয়েকে মেরে ফেলছে, তারা অফিসার মানুষ তাদের স্যার বলতে হয়। আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে ১১ বছর আগে। এত কথা কি আমার মনে আছে, আমাকে বহু হুমকি দিয়েছে মেরে ফেলবে, মোটরসাইকেল দিয়ে চাপা দিছে আল্লাহ আমাকে এখনো বাঁচাই রাখছে। তারা আমার মেয়েকে যেমনে হত্যা করেছে, আমিও চাই তেমনি তাদের শাস্তি হোক। ফাঁসি চাই তাদের, দেশবাসীও যাতে কইতে পারে, তনু হত্যায় তাদের ফাঁসি হইছে।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম কাঁদতে কাঁদতে গণমাধ্যমকে বলেন, আমার মেয়েকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচারটা হোক, আমি মেয়ের সুখের জন্য কষ্ট করছি এখনো মেয়েকে হারিয়ে সেই কষ্টই করতাছি। আমার মেয়ের হত্যার বিচারটা হলে আমি খুশি হব।

তনুর ভাই রুবেল হোসেন বলেন, দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান হয়েছে, আমার বোনের হত্যাকাণ্ডে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো যারা জড়িত আছে আশা করছি তাদেরকেও গ্রেপ্তার করা হবে, আমরা বিশ্বাস করি, আদালতে আমার বোনের হত্যার ন্যায় বিচার পাব।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ এপ্রিল মামলার সপ্তম তদন্ত কর্মকর্তা তিন সন্দেহভাজন তৎকালীন কুমিল্লা সেনানিবাসের সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক জাহাঙ্গীর ওরফে জাহিদের ডিএনএ ক্রস-ম্যাচিংয়ের কুমিল্লার আদালতে আবেদন করেন। আদালত এতে সম্মতি দেন।

মামলার বিবরণে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউজের অদূরে একটি ঝোপের মধ্যে তার মরদেহ পাওয়া যায়। তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে। পরদিন তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন।

২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায়, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, গত ৬ এপ্রিল এ মামলায় তিন সন্দেহভাজন- সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। আদালতের আদেশ পেয়ে অভিযুক্ত সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে নেওয়া হয়। আদালতে আমরা ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলাম, আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।