মুক্তবাণী রিপোর্ট : মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অনুষ্ঠানে দেশের গণমাধ্যম মালিক ও সম্পাদকরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপতথ্য ও গুজব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপতথ্য ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। এটি এখন দেশে মহামারি আকার ধারণ করেছে।
এ পরিস্থিতিতে সামাজিক সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপতথ্য মোকাবিলায় রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার বলে মন্তব্য করেন গণমাধ্যমের মালিক-সম্পাদকরা।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে রোববার বিকালে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নোয়াব সভাপতি মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম, সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ প্রমুখ।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমস্যা আলাদা। এটি টেক জায়ান্ট ছাড়া সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না।
বিটিআরসিও এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বড়জোর বন্ধ করে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশ ভালো জায়গা। তবে এদের সঙ্গে দেনদরবার করার মতো বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। তিনি বলেন, ‘প্রচলিত সরকার হচ্ছে বাটন ফোনের মতো। ফলে সমস্যা বোঝা বা সমাধানের জন্য আমাদের আগে প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তথ্যমন্ত্রী বলেন, একটি গণমাধ্যম কমিশন লাগবেই। তবে সরকার অভিভাবক হতে চায় না। কারণ সরকারও একটি পক্ষ-সে অপরাধ করতে পারে। তাই তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে পরামর্শক কমিটি করা হবে, যারা সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে গণমাধ্যম কমিশন গঠন করবে।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় যায় তখন বলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কথা। একই দল ক্ষমতার বাইরে থাকলে বলে, হাত খুলে লিখুন। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম কমিশন করার বিষয়ে সরকার সবার সঙ্গে আলোচনা করবে, এ কথা আর শুনতে চাই না। বাংলাদেশে যখনই স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম হয়ে যায়, তখনই এ দেশে বড় বড় গণ অভ্যুত্থান হয়। প্রতিটা গণ অভ্যুত্থানের পর কিছু কমিশন হয়। মানুষ বিশ্বাস করে এবার একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য, জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য, এই সরকার অনেক কিছু করবে।’
নোয়াব সভাপতি মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, অপতথ্যের কারণে সত্য এবং সৎ সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আশা ছিল কোনো মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হবে না। অথচ আজকেও প্রায় আড়াই শ অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এটি বাইরে নয়, বাংলাদেশে।
দেশে অপতথ্য এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক বলেন, সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এখান থেকে বের হওয়া অসম্ভব। প্রত্যেক ঘরে ঘরে সাংবাদিক। যে যা দেখছেন, তাই লিখে দিচ্ছেন। এজন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। গণমাধ্যমের সামনে আরও বেশি বিপদ অপেক্ষা করছে এমন আশঙ্কা করে নোয়াব সভাপতি বলেন, এই অপতথ্যের হাত থেকে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে কেউ নিরাপদ নয়।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম দেশে মূল্যবোধ ও ন্যায়ভিত্তিক সাংবাদিকতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, সংবিধানে শুধু দুটি পেশার স্বাধীনতার কথা উল্লেখ আছে। একটি বিচার বিভাগ এবং অন্যটি গণমাধ্যম। কোনোভাবেই এ দুটি পেশার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে আমাদের অবনতি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপতথ্য শুধু সমাজকে আক্রান্ত করছে তাই নয়, ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রকেও আক্রান্ত করছে। চরিত্র হনন হচ্ছে। নারীদের নিয়ে বুলিং হচ্ছে। সাইবার অপরাধ হচ্ছে। এসব খুবই উদ্বেগজনক বিষয়। এই অপতথ্য মোকাবিলার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার বলে জানান তিনি।