মো. হাফিজ উদ্দিন :
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই ভাইরাসটি যদিও দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত, তবু এমন একটি ঘটনায় অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এটি কি নতুন কোনো হুমকি? বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে ইঁদুরের উপদ্রব বেশি এবং জনঘনত্ব উল্লেখযোগ্য, এই ভাইরাস কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে ঝুঁকি খুবই সীমিত, তবে সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রতিবেদনে হান্টাভাইরাসের বিস্তারিত বিবরণ, এর ছড়ানোর ধরন, লক্ষণ, চিকিৎসা, মৃত্যুঝুঁকি এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
হান্টাভাইরাস মূলত একটি ইঁদুরবাহিত ভাইরাস, যা মানুষের দেহে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে সক্ষম। এটি হান্টাভিরিডি পরিবার এবং বুনিয়াভাইরালিস ক্রমের অন্তর্গত। সাধারণত এই ভাইরাস মানুষকে সংক্রমিত করে না, কিন্তু যখন করে, তখন এর প্রভাব হতে পারে মারাত্মক। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিভিন্ন স্ট্রেইন পাওয়া যায়, যা ভিন্ন ভিন্ন রোগের কারণ হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকা মহাদেশে এটি হান্টাভাইরাস কার্ডিওপালমোনারি সিনড্রোম (এইচসিপিএস) ঘটায়, যেখানে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস প্রধানত আক্রান্ত হয়। অন্যদিকে ইউরোপ ও এশিয়ায় এটি হান্টাভাইরাস হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (এইচএফআরএস) সৃষ্টি করে, যাতে কিডনি আক্রান্ত হয় এবং রক্তপাতের ঘটনা ঘটে।
এই ভাইরাসের ইতিহাস অনেক পুরনো। বিজ্ঞানীরা দশকের পর দশক ধরে এটি নিয়ে গবেষণা করছেন। তবে সাম্প্রতিককালে প্রমোদতরী এমভি হোন্ডিয়াসে ঘটা ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এনেছে। জাহাজটি আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল প্রায় এক মাস আগে। সেখানে সম্ভবত ইঁদুর বা দূষিত পরিবেশের সংস্পর্শে এসে কোনো যাত্রী প্রথমে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে জাহাজের সীমিত স্থান এবং ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এই ঘটনা নিয়ে তীব্রভাবে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত আটজনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ছয়জন নিশ্চিতভাবে আন্দেস ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, যা মৃত্যুহারকে প্রায় ৩৮ শতাংশে নিয়ে গেছে।
হান্টাভাইরাস কীভাবে মানুষের দেহে প্রবেশ করে? এর প্রধান মাধ্যম হলো সংক্রমিত ইঁদুরের প্রস্রাব, লালা বা মল। যখন এগুলো শুকিয়ে বাতাসে কণা আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। বিরল ক্ষেত্রে ইঁদুরের কামড়ের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। আমেরিকা মহাদেশের আন্দেস ভাইরাসের ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও এটি খুব সাধারণ নয়। সাধারণত এটি ঘটে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, যখন অসুস্থ ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ হয় এবং ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষমতা সর্বোচ্চ থাকে। জাহাজের মতো সীমিত জায়গায় এই ঝুঁকি বেড়ে যায়, কারণ যাত্রীরা একই কেবিন, ডাইনিং এরিয়া ভাগ করে ব্যবহার করেন।
সংক্রমণের পর লক্ষণ দেখা দিতে সময় লাগে এক থেকে আট সপ্তাহ। এই সময়কাল ভাইরাসের ধরনের উপর নির্ভর করে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী অনুভব করেন জ্বর, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা, পেটব্যথা, বমি বা বমিভাব। এগুলো সাধারণ ফ্লুর লক্ষণের মতো মনে হতে পারে, যা অনেক সময় বিভ্রান্তির কারণ হয়। পরবর্তী পর্যায়ে অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়, ফুসফুসে পানি জমে, রক্তপাত হতে পারে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়। এইচসিপিএস-এ হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা প্রধান, যেখানে রোগী দ্রুত অক্সিজেনের অভাবে ভুগতে শুরু করেন। এইচএফআরএস-এ কিডনি ফেলিওর এবং রক্তপাতের ঝুঁকি বেশি।
মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত বলতে গেলে, এটি ভাইরাসের ধরনের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমেরিকায় আন্দেস ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এইচসিপিএস হয় এবং মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ইউরোপ ও এশিয়ায় এইচএফআরএস-এ মৃত্যুহার ১ শতাংশের কম থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। বয়স্ক ব্যক্তি বা যাদের অন্যান্য রোগ আছে, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণভিত্তিক। যত তাড়াতাড়ি রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নিবিড় পরিচর্যা দেওয়া হয়, তত বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও কিডনির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্য সাপোর্টিভ কেয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ভাইরাসের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে এটি মহামারির আকার নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, হান্টাভাইরাস ইঁদুরবাহিত হলেও আমাদের দেশে এর সংক্রমণের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। বাংলাদেশে ইঁদুরের উপস্থিতি প্রচুর, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল এবং অপরিষ্কার এলাকায়। তাই তাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকি আছে, কিন্তু বাস্তবে এই ভাইরাস এখানে তেমন সক্রিয় নয়। আন্দেস ধরনের মতো মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর স্ট্রেইন এখানে সাধারণ নয়।
তবে সতর্কতা অবলম্বন না করলে যেকোনো সময় সমস্যা হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জনঘনত্ব, দরিদ্র স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি। বন্যা বা অতিবৃষ্টির সময় ইঁদুর ঘরের কাছে চলে আসে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। ডা. মুশতাক হোসেন জোর দিয়ে বলেছেন, ইঁদুরের সংস্পর্শ এড়ানো, বাসস্থান পরিষ্কার রাখা এবং পরিষ্কারের সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। হাত ধোয়ার অভ্যাস, খাবার ঢেকে রাখা এবং আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এই ভাইরাস প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ।
প্রমোদতরী এমভি হোন্ডিয়াসের ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী একটি সতর্কবার্তা। জাহাজটিতে প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন বিভিন্ন দেশ থেকে। আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়ার কাছে ল্যান্ডফিল বা দূষিত এলাকায় ভ্রমণের পর সম্ভবত প্রথম সংক্রমণ ঘটে। ডাচ দম্পতি সহ কয়েকজন আক্রান্ত হন। একজন নেদারল্যান্ডসের নারী সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নেমে যান এবং পরে মারা যান। তার স্বামীও আগে মারা গিয়েছিলেন। যাত্রীরা যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে ফিরে গেছেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে কন্টাক্ট ট্রেসিং চলছে। অনেক দেশ যাত্রীদের ৪৫ দিন পর্যন্ত আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
ডব্লিউএইচওর রোগতত্ত্ববিদ মারিয়া ভ্যান কারকোভ স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি কোভিড নয় বা ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ছড়ায়। হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক নয় এই ভাইরাস। সাধারণ সামাজিক মেলামেশায়—দোকানে যাওয়া, হাঁটা বা অফিসে যাওয়ায়—এটি ছড়ায় না। ঝুঁকি মূলত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘ সংস্পর্শে। সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি নগণ্য বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে দেখলে, বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের মতো অন্যান্য জুনোটিক রোগের অভিজ্ঞতা আছে। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে হান্টাভাইরাস মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। আইইডিসিআরসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের জন্য দ্রুত ডায়াগনোসিসের ব্যবস্থা রাখা দরকার। জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য ক্যাম্পেইন চালানো উচিত, যাতে মানুষ ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব বোঝে।
হান্টাভাইরাস নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এ ধরনের ভাইরাসের উত্থান বাড়ছে। মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংযোগ বেড়ে যাওয়ায় জুনোটিক রোগের ঝুঁকি বৈশ্বিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাসাবাড়িতে ইঁদুর মারার ফাঁদ ব্যবহার, খাদ্যশস্য সুরক্ষিত রাখা, ঘরের ফাটল বন্ধ করা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। যারা গ্রামীণ এলাকায় বা কৃষিকাজ করেন, তাদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। ভ্রমণকারীদের জন্যও পরামর্শ—অজানা এলাকায় বন্যপ্রাণী বা ইঁদুরের এলাকায় সাবধানতা অবলম্বন করুন।
চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণা চালিয়ে যাওয়া দরকার। যদিও টিকা নেই, তবু ভবিষ্যতে এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আপাতত সাপোর্টিভ কেয়ারই প্রধান অস্ত্র। রোগীকে অক্সিজেন সাপোর্ট, ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা বজায় রাখার চেষ্টা করতে হয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, হান্টাভাইরাস নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি কোনো মহামারির সূচনা নয়। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সচেতনতা বজায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যদি প্রস্তুত থাকে, তাহলে যেকোনো ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব। জনসাধারণকে আশ্বস্ত করা জরুরি যে, সাধারণ জীবনযাপনে এই ভাইরাসের প্রভাব খুবই সীমিত। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকলেই চলবে।
এই ঘটনা থেকে আমরা শিখতে পারি যে, বিশ্বায়নের যুগে একটি দেশের সমস্যা আরেক দেশকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা দরকার। বাংলাদেশ সরকার, এনজিও এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ধরনের ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পরিশেষে, পরিচ্ছন্নতা এবং সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।