সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৮ জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য, সংসদে উত্তাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্ত্রীকে নিয়ে বিএনপির সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর মন্তব্য ঘিরে সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।

রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় মনিরুলের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে হট্টগোল ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

বিরোধীদলীয় সদস্যদের হট্টগোলের পর বৈঠকের সভাপতি কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হকের বক্তব্যের একটি অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেন। সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্য না করার অনুরোধ জানান তিনি।

এদিন বাজেট আলোচনার একপর্যায়ে জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে দাবি করে মনিরুল হক বলেন, ওনাদের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। ১৯৬৮ সালে গোলাম আযমের ডাকে ঢাকায় আন্দোলন করেছি। হরতাল কমিটির আহ্বায়ক ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। গোলাম আযম সাহেব আমার দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহার করেছিলেন। এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

তিনি বলেন, আমি স্বীকার করি, জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন। লেখাপড়া করে রাজনীতি করেন। কিন্তু আপনারা যা পড়েন, তা ইতিহাসের সত্য-এই কথাটা ঠিক নয়। আর আপনাদের চেনা আরও কঠিন।

এরপর মনিরুল হক ২০০১ সালের একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, খন্দকার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী হওয়ার পর সংসদ সদস্যদের স্ত্রীসহ দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে যাননি, তবে জামায়াত নেতা তাহের গিয়েছিলেন।

মনিরুল বলেন, ঢোকার পর দেখি একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বলি, তাহের ভাই ভাবি কই? উনি বলেন, এই যে। তখন বলি, আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই এটা কেমনে বুঝব।

পরে বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমাদের হাউজে বোনেরা এমপি হয়ে এসেছেন। সবাই মেধাবী। দুইজনের বক্তৃতা শুনেছি, আগামীতে কিছু করতে পারবে, ভবিষ্যৎ আছে, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা? আপনারা এদিকে দেখতে পারেন, আমরা এদিকে দেখলে কী আছে বুঝব না, এটা ঠিক না।

তার এই বক্তব্যের পরই বিরোধী দলের সদস্যরা আসন থেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ডেপুটি স্পিকার বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা উচিত না।

তবে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। কয়েকজন সদস্য উচ্চস্বরে আপত্তি জানাতে থাকেন।

মনিরুল তখন বলেন, আমি কাউকে কিছু বলিনি। অতীতের একটি ঘটনার গল্প বলেছি। আমি কাউকে ছোট করিনি। যদি ছোট হয়ে থাকেন, তাহলে ক্ষমা চাইছি।

ডেপুটি স্পিকার কয়েক দফা সদস্যদের বসার অনুরোধ জানান। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা বসে পড়লে তিনি রুলিং দেন।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, আপনি (মনিরুল হক) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করা হল। এ রুলিংকে বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে স্বাগত জানান।

এরপর ডেপুটি স্পিকার পুরো সংসদকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা-আমরা সবাই জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য। আমরা যদি আমাদের শালীনতা, আমাদের সম্মান-মর্যাদা না রাখি জাতির কাছে, যারা আমাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন, তাদের কাছে লজ্জিত হব।

জবাবে মনিরুল হক বলেন, এ পরিস্থিতি আমি প্রত্যাশা করি নাই। যদি আমার কোনো বক্তব্য আকার-ইঙ্গিতে কারও লেগে থাকে, তাহলে অবশ্যই এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করব। আমার মনে হয়, ওনারা ভুল বুঝেছেন।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্ক কেন খারাপ হল, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত বলেও দাবি করেন মনিরুল হক।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তারেক রহমান নীলকণ্ঠ, বিষ খেয়ে বিষ হজম করেন।

একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রশংসা করে সরকারি দলের এই সদস্য বলেন, তিনি এত সুশৃঙ্খল কথা বলেন, যা অতীতে কখনো শুনি নাই।

এরপর তিনি অভিযোগ করেন, সংসদের বাইরে গিয়ে বিএনপিবিরোধী প্রচারপত্র বিতরণ করা হয় এবং তারেক রহমানকে ‘হেয়’ করা হয়। এ সময় আবারও সংসদে উত্তেজনা ছড়ায়।

আছরের নামাজের বিরতির পর বিষয়টি আবার সংসদে তোলেন বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

মনিরুল হকের বক্তব্যের বিশেষ অংশ বাদ দেওয়ায় ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, আজকে উনি তার বক্তব্যে যা বলেছেন, তা সংসদীয় রীতিনীতি এবং আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের সীমাকে অতিক্রম করে গেছে। প্রথমত, সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে তিনি কটাক্ষ করেছেন। উনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারে, ব্যক্তিগত ইতিহাস থাকতে পারে। কিন্তু সেটাকে সংসদে এনে যেভাবে কটাক্ষ করা হল, সেটা অমার্জনীয় অপরাধ।

নারী সংসদ সদস্যদের প্রসঙ্গ টেনে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির এই এমপি বলেন, আমাদের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে এবং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে যে ধরনের কথা বলা হয়েছে, সেটাও অমার্জনীয় অপরাধ। প্রত্যেক ব্যক্তির গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে, পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে সেই স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন।

নাহিদের ভাষায়, মনিরুল হকের বক্তব্যে বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে কোনো সংসদ সদস্য যেন এ ধরনের বক্তব্য না দেন।