আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য তাজমহলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন মোড় এসেছে। তাজমহল আসলে মোগল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত সমাধিসৌধ নাকি প্রাচীন হিন্দু মন্দির ‘তেজো মহালয়’ এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-কে হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট।
বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী হরি শঙ্কর জৈনের বক্তব্য শুনে কেন্দ্র ও এএসআই-এর কাছে জানতে চেয়েছে, বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তাজমহলে জরিপ পরিচালনায় বাধা কোথায়।
এ মামলার আবেদনকারীদের দাবি, তাজমহল মূলত ‘তেজো মহালয়’ নামে পরিচিত একটি প্রাচীন শিব মন্দির ছিল। তাদের অভিযোগ, পরবর্তীতে মোগল সম্রাট শাহজাহান এতে ইসলামি স্থাপত্যশৈলী যুক্ত করে এটি স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিসৌধে রূপান্তর করেন।
আবেদনকারীরা আরও দাবি করেন, তাজমহলের স্থাপত্যে অন্তত ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এটিকে একটি হিন্দু মন্দির হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে ইঙ্গিত বহন করে। তারা আদালতের কাছে একজন ‘অ্যাডভোকেট কমিশনার’ নিয়োগের আবেদন জানিয়েছেন, যাতে তিনি স্মৃতিস্তম্ভটি পরিদর্শন, ছবি তোলা ও ভিডিওগ্রাফি করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেন।
তাদের বক্তব্য, কেবল স্থাপত্য বিশ্লেষণের পরিবর্তে সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে, স্থাপনাটি আদতে শিব মন্দির ছিল কি না। একই সঙ্গে তারা তাজমহলকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা এবং সেখানে পূজা-অর্চনার অনুমতিও চেয়েছেন। সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার থেকেই তারা এ দাবি করছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের যুক্তিতে বলা হয়েছে, তাজমহলের প্রধান গম্বুজের ওপরের পদ্মপাপড়ির নকশা ও চূড়া হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া এএসআই-এর নথিতে একটি অংশকে ‘গোশালা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন, যা তাদের মতে মন্দির স্থাপনার বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘তেজো মহালয়’ নামে পরিচিত ওই শিব মন্দিরটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা পরমার্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন। পরে এটি রাজা মান সিং ও রাজা জয় সিংয়ের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর শাহজাহান সেটিকে রূপান্তর করে বর্তমান তাজমহল নির্মাণ করেন বলে আবেদনকারীদের দাবি।
এছাড়া আবেদনকারীরা অভিযোগ করেছেন, এএসআই তাজমহলের কয়েকটি তলা তালাবদ্ধ রেখে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত করেছে। তাদের মতে, এ কারণে আদালতের নিযুক্ত কমিশনারের মাধ্যমে স্থাপনাটির ভেতর ও বাইরের অংশ পরিদর্শন, ছবি ও ভিডিও ধারণের অনুমতি দেওয়া উচিত।
মামলার সঙ্গে দাখিল করা একটি অন্তর্বর্তীকালীন আবেদনে এএসআই-এর পরিচালককে আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে তাজমহলের অভ্যন্তর ও বহিরাংশের ছবি তুলে তা আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এর আগে ২০১৫ সালে আগ্রার একটি দেওয়ানি আদালতে এ বিষয়ে প্রথম মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৯ সালে পর্যাপ্ত প্রমাণ ও আইনি গ্রহণযোগ্যতার অভাব দেখিয়ে জরিপের আবেদন খারিজ করে দেন আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক (সিনিয়র ডিভিশন)। আদালত তখন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, আবেদনকারীরা সংশ্লিষ্ট জমির রাজস্ব নথিও উপস্থাপন করতে পারেননি।
পরে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিভিশন আবেদনও ২০২৬ সালের এপ্রিলে আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজ খারিজ করে দেন। এরপর আবেদনকারীরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন।
সর্বশেষ শুনানির পর হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআই-কে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে ১০ দিনের মধ্যে নোটিশ জারির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।