মুক্তবাণী রিপোর্ট : বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় এক আসামির মৃত্যুর গুজবকে কেন্দ্র করে হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মনে।
আর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্যাসিবাদী আমলে কতিপয় কর্মকর্তার নেতিবাচক ভূমিকার কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় জনরোষে পড়তে হয়েছিল গোটা পুলিশ বাহিনীকে। তবে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর অল্প অল্প করে পুলিশে যে মনোবল ফিরছিল, এই ঘটনা সেই অগ্রগতিতে ধাক্কা দিয়েছে।
আগৈলঝাড়া থানার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থামাতে না পারলে জনগণ ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফেরানো যাবে না। তাতে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাবে।
গত বৃহস্পতিবার চুরির মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরের (২৬) মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে শত শত স্থানীয় বাসিন্দা লাঠিসোঁটা নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা চালায়। হামলাকারীরা থানার ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে মারধর করেন এবং থানায় ভাঙচুর চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে উভয় পক্ষের সংঘর্ষে ছয় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১২ জন আহত হন।
শুক্রবার রাতে বরিশাল রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি মো. সাইফুল্লাহ বিন আনোয়ার বলেন, আগৈলঝাড়া থানায় হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় এ পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। থানায় হামলা করে পুলিশকে মারধরসহ সব বিষয় নিয়ে তদন্ত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের দুই কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, কিছু পুলিশ সদস্যের প্রাণহানি, থানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং অস্ত্র লুটের মতো ঘটনা ঘটে। ওইসব ঘটনা যদিও তৎকালীন সরকারের আমলে কিছু পুলিশ সদস্যের বিতর্কিত ভূমিকার বিরুদ্ধে জনরোষের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে অভ্যুত্থানকালে নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যার ক্ষোভ হজম করতে হয়েছে বাহিনীটিকে। কিন্তু সেসবের প্রভাব পুরো পুলিশ বাহিনীকেই দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপে রেখেছে।
তাদের ভাষ্য, সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে পুলিশ সদস্যরা আবারও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে। কিন্তু এরই মধ্যে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ওই কর্মকর্তারা বলেন, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আবারও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার আশঙ্কা থেকে যাবে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, থানায় হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল অটুট রাখতে এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
শুক্রবার আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদ খান বলেন, হামলাকারীরা থানা থেকে একটি ল্যাপটপ লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার অভিযান চলমান আছে। হামলার পর থেকে থানায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে।
আসামির বিষয়ে তিনি জানান, হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ করে সেই আসামিকে (রিয়াজ ফকির) আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মাসুদ খান জানান, গত বুধবার সন্ধ্যায় নিয়মিত অভিযানে একাধিক মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।
থানার হাজতে থাকা অবস্থায় তিনি নিজের মাথায় আঘাত করে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে পুলিশের দাবি। পরে রাতে ১১টার দিকে তাকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। গভীর রাতে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তাকে।
ওসি মাসুদ খান আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘থানায় ঢুকে এভাবে কেউ নির্যাতন করে? আমরা কার কাছে যাব। পাবলিক দেখেছে, সাংবাদিক দেখেছে—একটা যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, একটা যদি ভুল তথ্য পায়, এই পোশাক খুলে ফেলব।’
ঢাকার মতিঝিল এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ছোট-বড় যে কোনো অপরাধ থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষ পুলিশের সহযোগিতা কামনা করে। সেই পুলিশই যদি অসহায়ের মতো বলতে থাকে, থানায় এসে আমাদের মারধর করা হলো, হামলা করা হলো—এখন আমরা কার কাছে যাব? আগৈলঝাড়া থানার ওসি ক্ষোভ নিয়ে এসব কথাই বলেছেন। তাহলে সমাজকে বুঝতে হবে, সরকারকেও বুঝতে হবে আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখাই—দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের গর্বিত পুলিশ বাহিনী রয়েছে। তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। তাই এ ধরনের ঘটনা সরকারকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। পুলিশ যদি নিরাপদ না থাকে, মানুষ নিরাপত্তা পাবে কোথায়?
দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি :
অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ পুলিশ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর থানায় গিয়ে হামলা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনার পেছনে যে কারণই থাকুক না কেন, যারা হামলায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের বিভিন্ন ঘটনার সময় কিছু পুলিশ সদস্যের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বাহিনীকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে এবং অনেক স্থানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রভাবে বাংলাদেশ পুলিশের মনোবলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এমন সময় আবার একটি থানায় হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা বজায় রাখতে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
গুজব উসকানিতে সংঘবদ্ধ হামলা, পুলিশকে দুর্বল করার অপচেষ্টা:
আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, ভাঙচুর এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলেছে, একটি গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
শুক্রবার পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গুজবনির্ভর এ ধরনের হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি নয়, বরং দেশে গড়ে ওঠা ‘মব সংস্কৃতি’র বহিঃপ্রকাশ। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচারপ্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি এবং শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রচলিত আইন অনুযায়ী অসুস্থ আসামির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা পুলিশের আইনগত দায়িত্ব এবং মানবিক দায়িত্বেরও অংশ। গুজব ও উসকানিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা পুলিশের মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা বলেও মনে করে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটি দেশের নাগরিকদের গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে আইনকে শ্রদ্ধা করা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করা এবং যেকোনো অভিযোগ বা অসন্তোষের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, জনগণের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পুলিশ পেশাদারিত্ব, সংযম ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।