আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আগামী কয়েক বছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির মোট গাড়ির ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি হতে পারে।
তবে দশকের শেষ দিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার গতি কিছুটা কমে আসতে পারে। বৃহস্পতিবার চীনের রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি সিনোপেকের এক গবেষক এ তথ্য জানিয়েছেন। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ চীনে তেলের চাহিদা কমতে পারে।
বিশেষ করে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির সংখ্যা কমে যাওয়ায় তেলের ব্যবহারেও বড় প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিনোপেকের অর্থনীতি ও উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে তেলের চাহিদা ৫ কোটি ৬০ লাখ মেট্রিক টন কমতে পারে। প্রতিদিনের হিসাবে এই পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল তেলের সমান।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক পেট্রোলিয়াম সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিনোপেকের অর্থনীতি ও উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফেয়ারি ওয়াং।
তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে তেলের যে চাহিদা কমছে, তা চীনে পরিশোধিত তেলজাত পণ্যের মোট চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশের সমান। ওয়াংয়ের হিসাবে, কমে যাওয়া তেলের চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসেছে পেট্রোলচালিত গাড়ি থেকে। বাকি এক-তৃতীয়াংশ এসেছে ডিজেলচালিত গাড়ি থেকে। অর্থাৎ চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের চাহিদায়।
চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার। দেশটিতে গত জুলাইয়ে মোট গাড়ির ৬৫ শতাংশের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দেখা গেছে। গত বছর এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। আর ২০২০ সালে ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে। সিনোপেকের হিসাবে, এই পরিসংখ্যানে শুধু ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি নয়, বিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দেওয়া যায় এমন হাইব্রিড গাড়িও ধরা হয়েছে। ফেয়ারি ওয়াং বলেন, চীনের গণপরিবহনে ব্যবহৃত প্রায় সব গাড়িই এখন বিদ্যুৎচালিত।
চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি সহায়তা এবং দেশজুড়ে ব্যাপক চার্জিং অবকাঠামো তৈরি অন্যতম। ফেয়ারি ওয়াং বলেন, অতীতে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি মানুষের মধ্যে এই গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এর পাশাপাশি দেশজুড়ে দ্রুত চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে চীনে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ চার্জিং কেন্দ্র রয়েছে। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের নিজ বাড়িতে থাকা চার্জিং ব্যবস্থা। বাকি এক-তৃতীয়াংশ চার্জিং কেন্দ্র সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারেন।
চীনের বড় শহরগুলোর পাশাপাশি ছোট শহর ও অন্যান্য এলাকাতেও বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা সহজে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ পথ চলার সময় গাড়িতে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় কমছে। একই সঙ্গে গাড়ি কেনার পর কোথায় চার্জ দেওয়া হবে, সেই চিন্তাও আগের তুলনায় কমেছে। ফেয়ারি ওয়াংয়ের মতে, সহজে চার্জ দেওয়ার সুযোগ থাকায় আরও বেশি মানুষ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছেন। চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি শুধু দেশটির গাড়ির বাজারেই পরিবর্তন আনছে না। এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি ও তেলের বাজারেও।
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। দেশটির গাড়িতে পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমতে থাকলে ভবিষ্যতে অপরিশোধিত তেলের চাহিদাও কমতে পারে। সিনোপেকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু চলতি বছরই বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ চাহিদা কমতে পারে। তবে ২০৩০ সালের দিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ার গতি কিছুটা কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারপরও ওই সময়ের মধ্যে চীনের মোট গাড়ির ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বিশ্বের গাড়ির বাজারের পাশাপাশি চীনের জ্বালানি চাহিদা এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।